Showing posts with label রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর. Show all posts
Showing posts with label রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর. Show all posts

Friday, 12 June 2026

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- আষাঢ়

আষাঢ়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে।
ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে। 
বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর, 
আউশের ক্ষেত জলে ভরভর, 
কালি-মাখা মেঘে ও পারে আঁধার ঘনিছে দেখ্ চাহি রে। 
ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।।


ওই ডাকে শোনো ধেনু ঘনঘন, ধবলীরে আনো গোহালে। 
এখনি আঁধার হবে বেলাটুকু পোহালে। 
দুয়ারে দাঁড়ায়ে ওগো দেখ্ দেখি 
মাঠে গেছে যারা তারা ফিরিছে কি, 
রাখালবালক কী জানি কোথায় সারা দিন আজি খোয়ালে। 
এখনি আঁধার হবে বেলাটুকু পোহালে।।


শোনো শোনো ওই পারে যাবে বলে কে ডাকিছে বুঝি মাঝিরে। 
খেয়া-পারাপার বন্ধ হয়েছে আজি রে। 
পুবে হাওয়া বয়, কূলে নেই কেউ, 
দু কূল বাহিয়া উঠে পড়ে ঢেউ, 
দরদর বেগে জলে পড়ি জল ছলছল উঠে বাজি রে। 
খেয়া-পারাপার বন্ধ হয়েছে আজি রে।।
ওগো, আজ তোরা যাস নে গো, তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে। 


আকাশ আঁধার, বেলা বেশি আর নাহি রে। 
ঝরঝর ধারে ভিজিবে নিচোল, 
ঘাটে যেতে পথ হয়েছে পিছল, 
ওই বেণুবন দুলে ঘনঘন পথপাশে দেখ্ চাহি রে। 
ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।।


Sunday, 17 May 2020

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা -- প্রাণ

প্রাণ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে ,
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই ।
এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে
জীবন্ত হৃদয়-মাঝে যদি স্থান পাই !
ধরায় প্রাণের খেলা চিরতরঙ্গিত ,
বিরহ মিলন কত হাসি -অশ্রু-ময় ----
মানবের সুখে দুঃখে গাঁথিয়া সংগীত
যদি গো রচিতে পারি অমর- আলয় !
তা যদি না পারি , তবে বাঁচি যতকাল
তোমাদেরি মাঝখানে লভি যেন ঠাই ,
তোমরা তুলিবে বলে সকাল বিকাল
নব নব সংগীতের কুসুম ফুটাই ।
হাসিমুখে নিয়ো ফুল , তার পরে হায়
ফেলে দিয়ো ফুল , যদি সে ফুল শুকায় ।

Tuesday, 12 May 2020

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- কবির বয়স

কবির বয়স
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ওরে কবি , সন্ধ্যা হয়ে এল ,
কেশে তোমার ধরেছে যে পাক ---
বসে বসে উর্ধ্বপানে চেয়ে
শুনতেছ কি পরকালের ডাক ?
কবি কহে,সন্ধ্যা হল বটে,
শুনছি বসে লয়ে শ্রান্ত দেহ ,
এ পারে ওই পল্লীহতে যদি
আজো হঠা‌ৎ ডাকে আমায় কেহ।
যদি হোথায় বকুল-বনচ্ছায়ে
মিলন ঘটে তরুন-তরুণীতে ,
দুটি আঁখির পরে দুইটি আঁখি
মিলিতে চায় দুরন্ত সঙ্গীতে---
কে তাহাদের মনের কথা লয়ে
বীণার তারে তুলবে প্রতিধ্বনি
আমি যদি ভবের কূলে বসে
পরকালের ভালো-মন্দই গণি ?।

সন্ধ্যাতারা উঠে অস্তে গেল ,
চিতে নিবে গেল নদীর ধারে ,
কৃষ্ণপক্ষে হলুদবর্ণ চাঁদ
দেখা দিল বনের একটি পারে,
শৃগালসভা ডাকে উর্ধ্বরবে
পোড়ো বাড়ির শূণ্য আঙিনাতে-
এমন কালে কোনো গৃহত্যাগী
হেথায় যদি জাগতে আসে রাতে ,
জোড়হস্তে উর্ধ্বে তুলি মাথা
চেয়ে দেখে সপ্ত ঋষির পানে ,
প্রাণের কুলে আঘাত করে ধীরে
সুপ্তিসাগর শব্দবিহীন গানে ---
ত্রিভুবনের গোপন কথাখানি
কে জাগিয়ে তুলবে তাহার মনে
আমি যদি আমার মুক্তি নিয়ে
যুক্তি করি আপন গৃহকোণে ?।

কেশে আমার পাক ধরেছে বটে ,
তাহার পানে নজর এত কেন ?
পাড়ায় যত ছেলে এবং বুড়ো
সবার আমি একবয়সি জেনো ।
ওষ্ঠে কারো সরল সাদা হাসি
কারো হাসি আঁখির কোণে কোণে ,
কারো অশ্রু উছলে পড়ে যায়
কারো অশ্রু শুকায় মনে মনে ,
কেউ-বা থাকে ঘরের কোণে দোঁহে
জগৎ-মাঝে কেউ-বা হাঁকায় রথ ,
কেউ-বা মরে একলা ঘরের শোকে
জনারণ্যে কেউ-বা হারায় পথ ---
সবাই মোরে করেন ডাকাডাকি ,
কখন শুনি পরকালের ডাক ?
সবার আমি সমানবয়সি যে
চুলে আমার যত ধরুক পাক ।।

Saturday, 9 May 2020

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- দুঃসময়

দুঃসময়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে ,
সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া ,
যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অম্বরে ,
যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া ,
মহা-আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে ,
দিক-দিগন্ত অবগুন্ঠনে ঢাকা ---
তবু বিহঙ্গ , ওরে বিহঙ্গ মোর ,
এখনি , অন্ধ , বন্ধ কোরো না পাখা ।।

এ নহে মুখর বনমর্মরগুঞ্জিত ,
এ যে অজাগর - গরজে সাগর ফুলিছে ।
এ নহে কুঞ্জ কুন্দকুসুমরঞ্জিত ,
ফেনহিল্লোল কলকল্লোলে দুলিছে ।
কোথা রে সে তীর ফুল পল্লবপুঞ্জিত ,
কোথা রে সে নীড় , কোথা আশ্রয় শাখা !
তবু বিহঙ্গ , ওরে বিহঙ্গ মোর ,
এখনি , অন্ধ , বন্ধ কোরো না পাখা ।।

এখনো সমুখে রয়েছে সুচির শর্বরী ,
ঘুমায় অরুণ সুদূর অস্ত- অচলে ।
বিশ্বজগৎ নিঃশ্বাসবায়ু সম্বরি
স্তব্ধ আসনে প্রহর গণিছে বিরলে ।
সবে দেখা দিল অকূল তিমির সন্তরি
দূর দিগন্তে ক্ষীণ শশাঙ্ক বাঁকা ।
ওরে বিহঙ্গ , ওরে ব্বিহঙ্গ মোর ,
এখনি , অন্ধ , বন্ধ কোরো না পাখা ।।

উর্ধ্ব আকাশে তারাগুলি মেলে অঙ্গুলি ,
ইঙ্গিত করি তোমা-পানে আছে চাহিয়া ।
নিম্নে গভীর অধীর মরণ উচ্ছলি
শত তরঙ্গে তোমা-পানে উঠে ধাইয়া ।
বহুদূর তীরে কারা ডাকে বাঁধি অঞ্জলি---
' এসো এসো ' সুর করুণ মিনতী-মাখা ।
ওরে বিহঙ্গ , ওরে বিহঙ্গ মোর ,
এখনি , অন্ধ , বন্ধ কোরো না পাখা ।।

ওরে ভয় নাই , নাই স্নেহমোহবন্ধন ---
ওরে আশা নাই , আশা শুধু মিছে ছলনা ।
ওরে ভাষা নাই , নাই বৃথা বসে ক্রন্দন ---
ওরে গৃহ নাই , নাই ফুলসেজ-রচনা ।
আছে শুধু পাখা , আছে মহানভ- অঙ্গন
উষা-দিশাহারা নিবিড়- তিমির -আঁকা ।
ওরে বিহঙ্গ , ওরে বিহঙ্গ মোর ,
এখনি , অন্ধ , বন্ধ কোরো না পাখা ।।

Sunday, 3 May 2020

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা--কৃপণ

কৃপণ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


আমি ভিক্ষা করে ফিরতেছিলেম গ্রামের পথে পথে,
তুমি তখন চলেছিলে তোমার স্বর্ণরথে ।
অপূর্ব এক স্বপ্নসম লাগতেছিল চক্ষে মম ---
কী বিচিত্র শোভা তোমার, কী বিচিত্র সাজ ।
আমি মনে ভাবতেছিলেম এ কোন্ মহারাজ ।।

আজি শুভক্ষণে রাত পোহালো, ভেবেছিলেম তবে
আজ আমারে দ্বারে দ্বারে ফিরতে নাহি হবে ।
বাহির হতে নাহি হতে কাহার দেখা পেলেম পথে ,
চলিতে রথ ধনধান্য ছড়াবে দুই ধারে ---
মুঠা মুঠা কুড়িয়ে নেব , নেব ভারে ভারে ।।

দেখি সহসা রথ থেমে গেল আমার কাছে এসে ,
আমার মুখ-পানে চেয়ে নামলে তুমি হেসে ।
দেখে মুখের প্রসন্নতা জুড়িয়ে গেল সকল ব্যথা ,
হেনকালে কিসের লাগি তুমি অকস্মাৎ
'আমায় কিছু দাও গো ' বলে বাড়িয়ে দিলে হাত ।।

মরি, এ কী কথা রাজাধিরাজ,' আমায় দাও গো কিছু ' -
শুনে ক্ষণকালের তরে রইনু মাথা - নিচু ।
তোমার কিবা অভাব আছে ভিখারি ভিক্ষুকের কাছে !
এ কেবল কৌতুকের বশে আমায় প্রবঞ্চনা ।
ঝুলি হতে দিলেম তুলে একটি ছোটো কণা ।।

যবে পাত্রখানি ঘরে এনে উজার করি ---- একি ,
ভিক্ষা-মাঝে একটি ছোটো সোনার কণা দেখি !
দিলেম যা রাজ-ভিখারিরে স্বর্ণ হয়ে এল ফিরে ---
তখন কাঁদি চোখের জলে দুটি নয়ন ভরে ,
তোমায় কেন দিইনি আমার সকল শূন্য করে ?।

Wednesday, 19 February 2020

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর

বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দিনের আলো নিবে এল ,
সুয্যি ডোবে ডোবে ।
আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে
চাঁদের লোভে লোভে ।
মেঘের উপর মেঘ করেছে ,
রঙের উপর রং ।
মন্দিরেতে কাসঁর ঘন্টা
বাজল ঠঙ্ ঠঙ্ ।
ও পারেতে বৃষ্টি এল ,
ঝাপসা গাছপালা ।
এ পারেতে মেঘের মাথায়
একশো মানিক জ্বালা !
বাদলা হাওয়ায় মনে পড়ে
ছেলেবেলার গান ---
" বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর ,
নদেয় এল বান ! "

আকাশ জুড়ে মেঘের খেলা
কোথায় বা সীমানা ।
দেশে দেশে খেলে বেড়ায় ,
কেউ করে না মানা ।
কত নতুন ফুলের বনে
বিষ্টি দিয়ে যায় ।
পলে পলে নতুন খেলা
কোথায় ভেবে পায় ।
মেঘের খেলা দেখে কত
খেলা পড়ে মনে ----
কত দিনের লুকোচুরি
কত ঘরের কোনে ।
তারি সঙ্গে মনে পড়ে
ছেলেবেলার গান ----
" বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর ,
নদেয় এল বান ।"

মনে পড়ে , ঘরটি আলো
মায়ের হাসিমুখ ,
মনে পড়ে , মেঘের ডাকে
গুরু গুরু বুক ।
বিছানাটির একটি পাশে
ঘুমিয়ে আছে খোকা ,
মায়ের 'পরে দৌরাত্মি সে
না যায় লেখাজোকা ।
ঘরেতে দুরন্ত ছেলে
করে দাপাদাপি ।
বাইরেতে মেঘ ডেকে ওঠে ,
সৃষ্টি ওঠে কাঁপি ।
মনে পড়ে মায়ের মুখে
শুনেছিলাম গান ---
" বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর ,
নদেয় এল বান ।"

মনে পড়ে সুয়োরানি
দুয়োরানির কথা ,
মনে পড়ে অভিমানী
কঙ্কাবতীর ব্যথা ।
মনে পড়ে ঘরের কোনে
মিটি মিটি আলো ,
চারিদিকে দেয়ালেতে
ছায়া কালো কালো ।
বাইরে কেবল জলের শব্দ
ঝুপ্ ঝুপ্ ঝুপ্ ----
দস্যি ছেলে গল্প শোনে
একেবারে চুপ ।
তারি সঙ্গে মনে পড়ে
মেঘলা দিনের গান ----
" বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর ,
নদেয় এল বান ।"

কবে বিষ্টি পড়েছিল ,
বান এল সে কোথা ।
শিবঠাকুরের বিয়ে হল
কবেকার সে কথা ।
সেদিনও সে এমনিতরো
মেঘের ঘটাখানা ।
থেকে থেকে বিজুলি কি
দিতেছিল হানা ।
তিন কন্যে বিয়ে ক'রে
কী হল তার শেষে ।
না জানি কোন নদীর ধারে ,
না জানি কোন দেশে ,
কোন ছেলেরে ঘুম পাড়াতে
কে গাহিল গান ----
" বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর ,
নদেয় এল বান !"

Saturday, 21 December 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- আত্মসমর্পণ

আত্মসমর্পণ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তোমার আনন্দগানে আমি দিব সুর
যাহা জানি দু-একটি প্রীতিসুমধুর
অন্তরের ছন্দোগাথা ; দুঃখের ক্রন্দনে
বাজিবে আমার কন্ঠ বিষাদবিধুর
তোমার কন্ঠের সনে ; কুসুমে চন্দনে
তোমারে পূজিব আমি ; পরাব সিন্দূর
তোমার সীমান্তে ভালে ; বিচিত্র বন্ধনে
তোমারে বাঁধিব আমি , প্রমোদ সিন্ধুর
তরঙ্গেতে দিব দোলা নব ছন্দে তানে ।
মানব - আত্মার গর্ব আর নাহি মোর ,
চেয়ে তোর স্নিগ্ধশ্যাম মাতৃমুখ-পানে
ভালোবাসিয়াছি আমি ধূলিমাটি তোর ।
জন্মেছি যে মর্ত-কোলে ঘৃণা করি তারে
ছুটিব না স্বর্গ আর মুক্তি খুঁজিবারে ।

Monday, 16 December 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- নিরুদ্দেশ যাত্রা

নিরুদ্দেশ যাত্রা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আর কত দূরে নিয়ে যাবে মোরে
হে সুন্দরী ?
বলো , কোন পার ভিড়িবে তোমার
সোনার তরী ।
যখনি শুধাই , ওগো বিদেশিনী ,
তুমি হাসো শুধু , মধুরহাসিনী ---
বুঝিতে না পারি , কী জানি কী আছে
তোমার মনে ।
নীরবে দেখাও অঙ্গুলি তুলি
অকূল সিন্ধু উঠিছে আকুলি ,
দূরে পচিমে ডুবিছে তপন
গগনকোনে ।
কী আছে হোথায় --- চলেছি কিসের 
অন্বেষণে ?

বলো দেখি মোরে , শুধাই তোমায়
অপরিচিতা ---
ওই যেথা জ্বলে সন্ধ্যার কূলে
দিনের চিতা ,
ঝলিতেছে জল তরল অনল ,
গলিয়া পড়িছে অম্বরতল ,
দিকবধূ যেন ছলছল আঁখি
অশ্রুজলে ,
হোথায় কি আছে আলয় তোমার
ঊর্মিমুখর সাগরের পার
মেঘচুম্বিত অস্তগিরির
চরণতলে ?
তুমি হাসো শুধু মুখপানে চেয়ে
কথা না বলে ।

হূহূ করে বায়ু ফেলিছে সতত
দীর্ঘশ্বাস ।
অন্ধ আবেগে করে গর্জন 
জলোচ্ছ্বাস ।
সংশয়ময় ঘননীল নীর ,
কোনোদিকে চেয়ে নাহি হেরি তীর ,
অসীম রোদন জগৎ প্লাবিয়া
দুলিছে যেন ।
তারি পরে ভাসে তরনী হিরণ ,
তারি পরে পড়ে সন্ধ্যাকিরণ ,
তারি মাঝে বসি এ নীরব হাসি
হাসিছ কেন ?
আমি তো বুঝিনা কী লাগি তোমার
বিলাস হেন ।

যখন প্রথম ডেকেছিলে তুমি
' কে যাবে সাথে '
চাহিনু বারেক তোমার নয়নে
নবীন প্রাতে ।
দেখালে সমুখে প্রসারিয়া কর
পশ্চিমপানে অসীম সাগর ,
চঞ্চল আলো আশার মতন
কাঁপিছে জলে ।
তরীতে উঠিয়া শুধানু তখন
আছে কি হোথায় নবীন জীবন ,
আশার স্বপন ফলে কি হোথায়
সোনার ফলে ?
মুখপানে চেয়ে হাসিলে কেবল
কথা না বলে ।

তারপরে কভু উঠিয়াছে মেঘ
কখনো রবি ---
কখনো ক্ষুব্ধ সাগর কখনো
শান্তছবি ।
বেলা বয়ে যায় , পালে লাগে বায় ----
সোনার তরনী কোথা চলে যায় ,
পশ্চিমে হেরি নামিছে তপন
অস্তাচলে
এখন বারেক শুধাই তোমায় ,
স্নিগ্ধ মরণ আছে কি হোথায় , 
আছে কি শান্তি , আছে কি সুপ্তি
তিমিরতলে ?
হাসিতেছ তুমি তুলিয়া নয়ন
কথা না বলে ।

আঁধার রজনী আসিবে এখনি
মেলিয়া পাখা ,
সন্ধ্যা-আকাশে স্বর্ণ- আলোক
পড়িবে ঢাকা ।
শুধু ভাসে তব দেহসৌরভ ,
গায়ে উড়ে পড়ে বায়ুভরে তব
কেশের রাশি ।
বিকল হৃদয় বিবশ শরীর
ডাকিয়া তোমারে কহিব অধীর ,
' কোথা আছো , ওগো , করহ পরশ
নিকটে আসি ।'
কহিবে না কথা , দেখিতে পাব না
নীরব হাসি ।

Friday, 22 November 2019

শঙ্খ

শঙ্খ

তোমার শঙ্খ ধূলায় পড়ে , কেমন করে সইব !
বাতাস আলো গেল মরে , একি রে দুর্দৈব !
লড়বি কে আয় ধ্বজা বেয়ে , গান আছে যার ওঠ না গেয়ে ,
চলবি যারা চলরে ধেয়ে ---- আয় না রে নিঃশঙ্ক ।
ধূলায় পড়ে রইল চেয়ে ওই যে অভয় শঙ্খ ।।

চলেছিলাম পূজার ঘরে সাজিয়ে ফুলের অর্ঘ্য 
খুঁজি সারা দিনের পরে কোথায় শান্তিস্বর্গ ।
এবার আমার হৃদয়ক্ষত ভেবেছিলেম হবে গত ,
ধুয়ে মলিন চিহ্ণ যত হব নিষ্কলঙ্ক ।
পথে দেখি ধূলায় নত তোমার মহাশঙ্খ ।।

আরতিদীপ এই কি জ্বালা , এই কি আমার সন্ধ্যা ?
গাঁথব রক্তজবার মালা ? হায় রজনীগন্ধা !
ভেবেছিলাম যোঝাযুঝি মিটিয়ে পাব বিরাম খুঁজি ,
চুকিয়ে দিয়ে ঋণের পুঁজি লব তোমার অঙ্ক ।
হেনকালে ডাকল বুঝি নীরব তব শঙ্খ ।।

যৌবনেরই পরশমণি করাও তবে স্পর্শ ।
দীপক তানে উঠুক ধ্বনি দীপ্ত প্রাণের হর্ষ ।
নিশার বক্ষ বিদার করে উদ্ বোধনে গগন ভরে
অন্ধ দিকে দিগন্তরে জাগাও না আতঙ্ক ।
দুই হাতে আজ তুলব ধরে তোমার জয়শঙ্খ ।।

জানি জানি তন্দ্রা মম রইবে না আর চক্ষে ।
জানি শ্রাবণ-ধারাসম বাণ বাজিছে বক্ষে ।
কেউ বা ছুটে আসবে পাশে , কাঁদবে বা কেউ দীর্ঘশ্বাসে ,
দুঃস্বপনে কাঁপবে ত্রাসে সুপ্তির পর্যঙ্ক ।
বাজবে যে আজ মহোল্লাসে তোমার মহাশঙ্খ ।।

তোমার কাছে আরাম চেয়ে পেলেম শুধু লজ্জা ।এবার সকল অঙ্গ ছেয়ে পড়াও রণসজ্জা ।
ব্যাঘাত আসুক নব নব --- আঘাত খেয়ে অচল রব ,
বক্ষে আমার দুঃখে তব বাজবে জয়ডঙ্ক ।
দেব সকল শক্তি , লব অভয় তব শঙ্খ ।।

Thursday, 8 August 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- প্রশ্ন

প্রশ্ন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত, পাঠায়েছ বারে বারে

                     দয়াহীন সংসারে,

তারা বলে গেল "ক্ষমা করো সবে', বলে গেল "ভালোবাসো--

                     অন্তর হতে বিদ্বেষ-বিষ নাশো'।

বরণীয় তারা, স্মরণীয় তারা, তবুও বাহির-দ্বারে

আজি দুর্দিনে ফিরানু তাদের ব্যর্থ নমস্কারে।

আমি-যে দেখেছি গোপন হিংসা কপট রাত্রিছায়ে

               হেনেছে নিঃসহায়ে,

আমি-যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে

               বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে

আমি-যে দেখিনু তরুণ বালক উন্মাদ হয়ে ছুটে

কী যন্ত্রণায় মরেছে পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে।

কণ্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে, বাঁশি সংগীতহারা,

                 অমাবস্যার কারা

লুপ্ত করেছে আমার ভুবন দুঃস্বপনের তলে,

                 তাই তো তোমায় শুধাই অশ্রুজলে--

যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,

তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো।

Tuesday, 2 July 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ---- কৃষ্ণকলি

কৃষ্ণকলি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি ,

কালো তারে বলে গায়ের লোক ।
মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে
কালো মেয়ের কালো হরিণ- চোখ ।
ঘোমটা মাথায় ছিল না তার মোটে ,
মুক্তবেণী পীঠের পরে লোটে ।
কালো ? তা সে যতই কালো হোক ,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ ।।

ঘন মেঘে আঁধার হল দেখে

ডাকতেছিল শ্যামল দুটি গাই ,
শ্যামা মেয়ে ব্যস্ত ব্যাকুল পদে
কুটির হতে ত্রস্ত এল তাই ।
আকাশ-পানে হানি যুগল ভুরু
শুনলে বারেক মেঘের গুরুগুরু ।
কালো ? তা সে যতই কালো হোক ,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ ।।

পুবে বাতাস এল হঠাৎ ধেয়ে ,

ধানের ক্ষেতে খেলিয়ে গেল ঢেউ ।
আলের ধারে দাঁড়িয়েছিলেম একা ,
মাঠের মাঝে আর ছিল না কেউ ।
আমার পানে দেখলে কিনা চেয়ে ,
আমিই জানি আর জানে সেই মেয়ে ।
কালো ? তা সে যতই কালো হোক ,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ ।।

এমনি ক'রে কালো কাজল মেঘ

জ্যৈষ্ঠ মাসে আসে ঈশান কোনে ।
এমনি ক'রে কালো কোমল ছায়া
আষাঢ় মাসে নামে তমাল-বনে ।
এমনি ক'রে শ্রাবণ-রজনীতে
হঠাৎ খুশি ঘনিয়ে আসে চিতে ।
কালো ? তা সে যতই কালো হোক ,
দেখেছি তার কালোহরিণ-চোখ ।।

কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি ,

আর যা বলে বলুক অন্য লোক ।
দেখেছিলেম ময়নাপাড়ার মাঠে
কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ ।।
মাথার 'পরে দেয়নি তুলে বাস ,
লজ্জা পাবার পায়নি অবকাশ ।
কালো ? তা সে যতই কালো হোক ,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ ।।

Friday, 14 June 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ----- আমি চঞ্চল হে

আমি চঞ্চল হে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমি চঞ্চল হে ,
আমি সুদূরের পিয়াসি ।
দিন চলে যায় , আমি আনমনে
তারি আশা চেয়ে থাকি বাতায়নে -------
ওগো , প্রাণে মনে আমি যে তাহার পরশ পাবার প্রয়াসি !
আমি সুদূরের পিয়াসি ।
সুদূর , বিপুল সুদূর , তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি -----
মোর ডানা নাই , আছি এক ঠাই , সে কথা যে যাই পাসরি ।।

আমি উন্মনা হে , 
হে সুদূর , আমি উদাসী ।
রৌদ্রমাখানো অলস বেলায়
তরুমর্মরে , ছায়ার খেলায় ,
কী মুরতি তব নীলাকাশশায়ী নয়নে উঠে গো আভাসি ।
হে সুদূর , আমি উদাসী ।
সুদূর , বিপুল সুদূর , তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি -----
কক্ষে আমার রুদ্ধ দুয়ার , সে কথা যে যাই পাসরি ।।

Tuesday, 11 June 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ----- আমি

আমি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ ,
চুনি উঠল রাঙা হয়ে ।
আমি চোখ মেললুম আকাশে -----
জ্বলে উঠল আলো
পুবে পশ্চিমে ।
গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম ' সুন্দর ' ,
সুন্দর হল সে ।

তুমি বলবে এ যে তত্ত্বকথা , এ কবির বাণী নয় ।
আমি বলব , এ সত্য ,
তাই এ কাব্য ।
এ আমার অহংকার ------
অহংকার সমস্ত মানুষের হয়ে ।
মানুষের অহংকার-পটেই
বিশ্বকর্মার বিশ্বশিল্প ।
তত্ত্বজ্ঞানী জপ করছেন নিশ্বাসে প্রশ্বাসে -----
না , না , না ----
না পান্না , না চুনি , না আলো , না গোলাপ ,
না আমি , না তুমি ।
ও দিকে , অসীম যিনি তিনি স্বয়ং করছেন সাধনা
মানুষের সীমানায় , 
তাকেই বলে ' আমি ' ।
সেই আমির গহনে আলো-আঁধারের ঘটল সংগম ,
দেখা দিল রূপ , জেগে উঠল রস ।
' না ' কখন ফুটে উঠে হল ' হাঁ ' , মায়ার মন্ত্রে ,
রেখায় রঙে , সুখে দুঃখে ।।

একে বোলো না তত্ত্ব ;
আমার মন হয়েছে পুলকিত
বিশ্ব- আমির রচনার আসরে
হাতে নিয়ে তুলি , পাত্রে নিয়ে রঙ ।।

পন্ডিত বলছেন ------
বুড়ো চন্দ্রটা , নিষ্ঠুর চতুর হাসি তার ,
মৃত্যুদূতের মত গুঁড়ি মেরে আসছে সে
পৃথিবীর পাঁজরের কাছে ।
একদিন দেবে চরম টান তার সাগরে পর্বতে ;
মর্তলোকে মহাকালের নূতন খাতায়
পাতা জুড়ে নামবে একটা শূন্য ,
গিলে ফেলবে দিনরাতের জমাখরচ ;
মানুষের কীর্তি হারাবে কমরতার ভান ,
তার ইতিহাসে লেপে দেবে
অনন্ত রাত্রির কালি ।
মানুষের যাবার দিনের চোখ
বিশ্ব থেকে নিকিয়ে নেবে রঙ ,
মানুষের যাবার দিনের মন
ছানিয়ে নেবে রস ।
শক্তির কম্পন চলবে আকাশে আকাশে ,
জ্বলবে না কোথাও আলো ।
বীণাহীন সভায় যন্ত্রীর আঙুল নাচবে ,
বাজবে না সুর ।
সেদিন কবিত্বহীন বিধাতা একা রবেন বসে
নীলিমাহীন আকাশে
ব্যক্তিত্বহারা অস্তিত্বের গনিততত্ত্ব নিয়ে ।
তখন বিরাট বিশ্বভুবনে
দূরে দূরান্তে অনন্ত অসংখ্যলোকে লোকান্তরে
এ বাণী ধ্বনিত হবে না কোনোখানেই -------
' তুমি সুন্দর '
' আমি ভালোবাসি ' ।
বিধাতা কি আবার বসবেন সাধনা করতে
যুগযুগান্তর ধরে ?
প্রলয়সন্ধ্যায় জপ করবেন ------
' কথা কও , কথা কও ' ,
বলবেন ' বলো , তুমি সুন্দর ' ,
বলবেন ' বলো , আমি ভালোবাসি ' ?

Friday, 31 May 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা - সবুজের অভিযান

ওরে নবীন , ওরে আমার কাঁচা ,
ওরে সবুজ , ওরে অবুঝ ,
আধ-মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা ।
রক্ত আলোর মদে মাতাল ভোরে ,
আজকে যে যা বলে বলুক তোরে ,
সকল তর্ক হেলায় তুচ্ছ করে
পুচ্ছটি তোর উচ্চে তুলে নাচা ।
আয় দুরন্ত , আয়রে আমার কাঁচা ।।

খাঁচাখানা দুলছে মৃদু হাওয়ায় ;
আর তো কিছুই নড়ে না রে
ওদের ঘরে , ওদের ঘরের দাওয়ায় ।
ওই যে প্রবীন , ওই যে পরম পাকা -----
চক্ষুকর্ণ দুইটি ডানায় ঢাকা ,
ঝিমায় যেন চিত্রপটে আঁকা
অন্ধকারে বন্ধ করা খাঁচায় ।
আয় জীবন্ত , আয়রে আমার কাঁচা ।।

বাহির পানে তাকায় না যে কেউ ,
দেখে না যে বান ডেকেছে -----
জোয়ার-জলে উঠছে প্রবল ঢেউ ।
চলতে ওরা চায়না মাটির ছেলে
মাটির পরে চরণ ফেলে ফেলে ,
আছে অচল আসনখানা মেলে
যে যার আপন উচ্চ বাঁশের মাঁচায় ।
আয় অশান্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।।

তোরে হেথায় করবে সবাই মানা ।
হঠাৎ আলো দেখবে যখন
ভাববে , একি বিষম কান্ডখানা !
সংঘাতে তোর উঠবে ওরা রেগে ,
শয়ন ছেড়ে আসবে ছুটে বেগে
সেই সুযোগে ঘুমের থেকে জেগে
লাগবে লড়াই মিথ্যা এবং সাঁচায় ।
আয় প্রচন্ড , আয়রে আমার কাঁচা ।।

শিকল-দেবীর ওই যে পূজাবেদি
চিরকাল কি রইবে খাড়া ?
পাগলামি , তুই আয়রে দুয়ার ভেদি ।
ঝড়ের মাতন বিজয়-কেতন নেড়ে
অট্টহাস্যে আকাশখানা ফেড়ে
ভোলানাথের ঝোলাঝুলি ঝেড়ে
ভুলগুলো সব আনরে বাছা বাছা ।
আয় প্রমত্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।।

আনরে টেনে বাঁধা পথের শেষে ।
বিবাগি কর অবাধ-পানে ,
পথ কেটে যাই অজানাদের দেশে ।
আপদ আছে , জানি আঘাত আছে ,
তাই জেনে তো বক্ষে পরাণ নাচে ----
ঘুচিয়ে দে ভাই , পুঁথিপোড়োর কাছে
পথে চলার বিধি বিধান যাচা ।
আয় প্রমুক্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।।

চিরযুবা তুই যে চিরজীবী ,
জীর্ণ জরা ঝরিয়ে দিয়ে
প্রাণ অফুরাণ ছড়িয়ে দেদার দিবি ।
সবুজ নেশায় ভোর করেছিস ধরা ,
ঝড়ের মেঘে তোরই তড়িৎ ভরা ,
বসন্তেরে পরাস আকুল-করা
আপন গলার বকুল মালা-গাছা ।
আয় রে অমর , আয় রে আমার কাঁচা ।।

Tuesday, 23 April 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- খেলাভোলা

খেলাভোলা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তুই কি ভাবিস দিন রাত্তির
খেলতে আমার মন ?
কক্ষনো তা সত্যি না মা ,
আমার কথা শোন ।

সেদিন ভোরে দেখি উঠে
বৃষ্টি বাদল গেছে ছুটে ,
রোদ উঠেছে ঝিলমিলিয়ে
বাঁশের ডালে ডালে ।

ছুটির দিনে কেমন সুরে
পুজোর সানাই বাজছে দূরে ,
তিনটি শালিক ঝগড়া করে
রান্নাঘরের চালে ।

খেলনাগুলো সামনে মেলি
কিযে খেলি , কি যে খেলি ,
সেই কথাটাই সমস্তক্ষণ
ভাবনু আপন মনে ।

লাগল না ঠিক কোনো খেলাই
কেটে গেল সারা বেলাই ---
রেলিং ধরে রইনু বসে
বারান্দাটার কোনে ।।

খেলাভোলার দিন মা ,
আমার আসে মাঝে মাঝে ---
সেদিন আমার মনের ভিতর
কেমনতর বাজে ।

শীতের বেলায় দুই পহরে
দূরে কাদের ছাদের পরে
ছোট্ট মেয়ে রোদ্দুরে দেয়
বেগনি রঙের শাড়ি ।

চেয়ে চেয়ে চুপ করে রই ,
তেপান্তরের পার বুঝি ওই ---
মনে ভাবি ওইখানেতেই
আছে রাজার বাড়ি  ।

থাকত যদি মেঘে ওড়া
পক্ষীরাজের বাচ্ছা ঘোড়া ,
তক্ষুনি যে যেতেম তারে
লাগাম দিয়ে কষে ।

যেতে যেতে নদীর তীরে
ব্যঙ্গমা আর ব্যঙ্গমীরে।
পথ শুধিয়ে নিতেম আমি
গাছের তলায় বসে।।

এক এক দিন যে দেখেছি
তুই বাবার চিঠি হাতে
চুপ করে কী ভাবিস বসে
ঠেস দিয়ে জানালাতে।

মনে হয় তোর মুখ চেয়ে
তুই যেন কোন দেশের মেয়ে,
যেন আমার অনেক কালের
অনেক দূরের মা।

কাছে গিয়ে হাতখানি ছুই
হারিয়ে যাওয়া মা যেন তুই,
মাঠ পারে কোন বটের তলায়
বাঁশির সুরের মা।

খেলার কথা যায় যে ভেসে,
মনে ভাবি কোন কালে সে
কোন দেশে তোর বাড়ি ছিল
কোন সাগরের কুলে।

ফিরে যেতে ইচ্ছে করে
অজানা সেই দ্বীপের ঘরে
তোমায় আমায় ভোর ‌বেলাতে
নৌকোতে পাল তুলে।।

Saturday, 20 April 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- আগমন

আগমন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তখন রাত্রি আঁধার হল , সাঙ্গ হল কাজ ---

আমরা মনে ভেবেছিলেম , আসবে না কেউ আজ ।
মোদের গ্রামে দুয়ার যত     রূদ্ধ হল রাতের মতো ---
দুয়েকজনে বলেছিল , ' আসবে মহারাজ  ' ।
আমরা হেসে বলেছিলাম , ' আসবে না কেউ আজ ' ।

দ্বারে যেন আঘাত হল শুনেছিলেম সবে ---

আমরা তখন বলেছিলেম , ' বাতাস বুঝি হবে ' ।
নিবিয়ে প্রদীপ ঘরে ঘরে    শুয়েছিলেম আলসভরে ----
দুয়েকজনে বলেছিল , ' দূত এল বা তবে । '
আমরা হেসে বলেছিলেম , ' বাতাস বুঝি হবে ।'

নিশীথ রাতে শোনা গেল কিসের যেন ধ্বনি ---

ঘুমের ঘোরে ভেবেছিলেম মেঘের গরজনি ।
ক্ষণে ক্ষণে চেতন করি      কাঁপল ধরা থরহরি ---
দুয়েকজনে বলেছিল , ' চাকার ঝনঝনি ' ।
ঘুমের ঘরে কহি মোরা ' মেঘের গরজনি ' ।

তখনো রাত আঁধার আছে , বেজে উঠল ভেরী ---

কে ফুকারে ' জাগো সবাই , আর কোরো না দেরি । '
বক্ষ'পরে দুহাত চেপে     আমরা ভয়ে উঠি কেঁপে ,
দুয়েক জনে কহে কানে , ' রাজার ধ্বজা হেরি । '
আমরা জেগে উঠে বলি , ' আর তবে নয় দেরি । '

কোথায় আলো , কোথায় মালা , কোথায় আয়োজন !

রাজা আমার দেশে এল , কোথায় সিংহাসন !
হায় রে ভাগ্য , হায় রে লজ্জা --- কোথায় সভা কোথায় সজ্জা !
দুয়েক জনে কহে কানে , ' বৃথা এ ক্রন্দন , 
রিক্তকরে শূণ্য ঘরে করো অভ্যর্থন ।'
ওরে , দুয়ার খুলে দে রে , বাজা শঙ্খ বাজা ---
গভীর রাতে এসেছে আজ আঁধার ঘরের রাজা ।
বজ্র ডাকে শূণ্যতলে ,    বিদ্যুতেরই ঝিলিক ঝলে ,
ছিন্ন শয়ন টেনে এনে আঙিনা তোর সাজা ----
ঝড়ের সাথে হঠাৎ এল দুঃখ রাতের রাজা ।

Monday, 8 April 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- সুখদুঃখ

সুখদুঃখ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বসেছে আজ রথের তলায় 
স্নানযাত্রার মেলা ।
সকাল থেকে বাদল হল
ফুরিয়ে এল বেলা ।
আজকে দিনের মেলামেশা ,
যত খুশি , যতই নেশা ,
সবার চেয়ে আনন্দময়
ওই মেয়েটির হাসি ।
এক পয়সায় কিনেছে ও
তালপাতার এক বাঁশি ।
বাজে বাঁশি , পাতার বাঁশি
আনন্দস্বরে ।
হাজার লোকের হর্ষধ্বনি
সবার উপরে ।

ঠাকুরবাড়ি ঠেলাঠেলি
লোকের নাহি শেষ ।
অবিশ্রান্ত বৃষ্টিধারায়
ভেসে যায় রে দেশ ।
আজকে দিনের দুঃখ যত
নাই রে দুঃখ উহার মত
ওই যে ছেলে কাতর চোখে
দোকান-পানে চাহি ,
একটি রাঙা লাঠি কিনবে
একটি পয়সা নাহি ।
চেয়ে আছে নিমেষহারা,
নয়ন অরুণ ।
হাজার লোকের মেলাটিরে
করেছে করুণ ।

Thursday, 4 April 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- আফ্রিকা

আফ্রিকা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

উদভ্রান্ত সেই আদিম যুগে

স্রষ্টা যখন নিজের প্রতি অসন্তোষে
নতুন সৃষ্টিকে বারবার করছিলেন বিধ্বস্ত ,
তাঁর সেই অধৈর্যে ঘন-ঘন মাথা নাড়ার দিনে
রুদ্র সমুদ্রের বাহু
প্রাচী ধরিত্রীর বুকের থেকে
ছিনিয়ে নিয়ে গেল তোমাকে , আফ্রিকা ---
বাঁধলে তোমাকে বনস্পতির নিবিড় পাহারায়
কৃপণ আলোর অন্তঃপুরে ।
সেখানে নিভৃত অবকাশে তুমি
সংগ্রহ করছিলে দুর্গমের রহস্য ,
চিনছিলে জলস্থল- আকাশের দুর্বোধ সংকেত ,
প্রকৃতির দৃষ্টি-অতীত জাদু
মন্ত্র জাগাচ্ছিল , তোমার চেতনাতীত মনে ।
বিদ্রূপ করছিলে ভীষণকে
বিরূপের ছদ্মবেশে ,
শঙ্কাকে চাচ্ছিলে হার মানাতে
আপনাকে উগ্র ক'রে বিভীষিকার প্রচন্ড মহিমায়
তান্ডবের দুন্দুভি নিনাদে ।।

হায় ছায়াবৃতা ,

কালো ঘোমটার নীচে
অপরিচিত ছিল তোমার মানবরূপ
উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে ।
এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে ,
নখ যাদের তীক্ষ্ম তোমার নেকড়ের চেয়ে ,
এল মানুষ-ধরার দল
গর্বে যারা অন্ধ তোমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে ।
সভ্যের বর্বর লোভ
নগ্ন করল আপন নির্লজ্জ অমানুষতা ।
তোমার ভাষাহীন ক্রন্দনে বাষ্পাকুল অরণ্যপথে
পঙ্কিল হলো ধূলি তোমার রক্তে অশ্রুতে মিশে ,
দস্যু-পায়ের কাঁটা-মারা জুতোর তলায়
বীভৎস কাদার পিন্ড
চিরচিহ্ণ দিয়ে গেল তোমার অপমানিত ইতিহাসে ।।

সমুদ্রপারে সেই মুহূর্তেই তাদের পাড়ায় পাড়ায়

মন্দিরে বাজছিল পূজার ঘন্টা
সকালে সন্ধ্যায় দয়াময় দেবতার নামে ;
শিশুরা খেলছিল মায়ের কোলে ;
কবির সংগীতে বেজে উঠেছিল
সুন্দরের আনাগোনা ।।

আজ যখন পশ্চিম দিগন্তে

প্রদোষকাল ঝঞ্ঝাবাতাসে রূদ্ধশ্বাস ,
যখন গুপ্ত গহ্বর থেকে পশুরা বেরিয়ে এল ---
অশুভ ধ্বনিতে ঘোষণা করল দিনের অন্তিমকাল ,
এসো যুগান্তের কবি ,
আসন্ন সন্ধ্যার শেষ রশ্মিপাতে
দাঁড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে ;
বলো ' ক্ষমা করো ' ----
হিংস্র প্রলাপের মধ্যে
সেই হোক তোমার সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী ।।

Saturday, 30 March 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- দেবতার বিদায়

দেবতার বিদায়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দেবতামন্দিরমাঝে ভকত প্রবীণ
জপিতেছে জপমালা বসি নিশিদিন।
হেনকালে সন্ধ্যাবেলা ধুলিমাখা দেহে
বস্ত্রহীন জীর্ণ দীন পশিল সে গেহে।
কহিল কাতরকণ্ঠে "গৃহ মোর নাই
এক পাশে দয়া করে দেহো মোরে ঠাঁই।"
সসংকোচে ভক্তবর কহিলেন তারে,
"আরে আরে অপবিত্র, দূর হয়ে যারে।"
সে কহিল, "চলিলাম"--চক্ষের নিমেষে
ভিখারি ধরিল মূর্তি দেবতার বেশে।

ভক্ত কহে, "প্রভু, মোরে কী ছল ছলিলে!"
দেবতা কহিল, "মোরে দূর করি দিলে।
জগতে দরিদ্ররূপে ফিরি দয়াতরে,
গৃহহীনে গৃহ দিলে আমি থাকি ঘরে।"



Thursday, 28 March 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা -- হারিয়ে-যাওয়া

হারিয়ে-যাওয়া
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ছোট্ট আমার মেয়ে
সঙ্গিনীদের ডাক শুনতে পেয়ে
সিঁড়ি দিয়ে নিচের তলায় যাচ্ছিল সে নেমে
অন্ধকারে ভয়ে ভয়ে , থেমে থেমে।
হাতে ছিল প্রদীপখানি,
আঁচল দিয়ে আড়াল করে চলছিল সাবধানী।


আমি ছিলাম ছাতে
তারায়-ভরা চৈত্রমাসের রাতে।
হঠাৎ মেয়ের কান্না শুনে উঠে
দেখতে গেলেম ছুটে।
সিঁড়ির মধ্যে যেতে যেতে
প্রদীপটা তার নিভে গেছে বাতাসেতে।
শুধাই তারে, “কী হয়েছে বামী ?”
সে কেঁদে কয় নিচে থেকে, “হারিয়ে গেছি আমি।”


তারায় ভরা চৈত্রমাসের রাতে
ফিরে গিয়ে ছাতে
মনে হল আকাশ-পানে চেয়ে
আমার বামীর মতোই যেন অমনি কে এক মেয়ে
নীলাম্বরের আঁচলখানি ঘিরে
দীপশিখাটি বাঁচিয়ে একা চলছে ধীরে ধীরে।
নিবত যদি আলো, যদি হঠাৎ যেত থামি
আকাশ ভরে উঠত কেঁদে, “হারিয়ে গেছি আমি।”