Showing posts with label কাজী নজরুল ইসলাম. Show all posts
Showing posts with label কাজী নজরুল ইসলাম. Show all posts

Tuesday, 4 June 2019

কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা --- মানুষ

মানুষ
কাজী নজরুল ইসলাম

গাহি সাম্যের গান—
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।–-

‘পূজারী, দুয়ার খোল,
ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পূজার সময় হলো!’
স্বপন দেখিয়ে আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়,
দেবতার বরে রাজা-টাজা আজ হয়ে যাবো নিশ্চয়!—
জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুধায় কন্ঠ ক্ষীণ
ডাকিল পান্থ, ‘দ্বার খোল বাবা, খাইনি ক’ সাত দিন।
সহসা বন্ধ হ’ল মন্দির, ভুখারি ফিরিয়া চলে,
তিমির রাত্রি, পথ জুরে তার ক্ষুধার মানিক জ্বলে!
ভুখারি ফুকারি কয়,
ঐ মন্দির পূজারীর, হায় দেবতা, তোমার নয়!

মসজিদে কাল শিরনি আছিল, অঢেল গোস্ত-রুটি
বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটিকুটি!
এমন সময় এল মুসাফির গায়ে আজারির চিন,
বলে, ‘বাবা, আমি ভুখা-ফাখা আছি আজ নিয়ে সাত দিন!’
তেরিয়াঁ হইয়া হাকিল মোল্লা---“ভ্যালা হ’ল দেখি লেঠা,
ভুখা আছ মর গো-ভাগারে গিয়ে! নামাজ পড়িস বেটা?”
ভুখারি কহিল, “না বাবা!” মোল্লা হাঁকিল,---“তা’ হলে শালা,
সোজা পথ দেখ!” গোস্ত-রুটি নিয়া মসজিদে দিল তালা!

ভখারি ফিরিয়া চলে,
চলিতে চলিতে বলে---
“আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু,
আমার ক্ষুধার অন্ন তা’বলে বন্ধ করোনি প্রভু,
তব মসজিদ-মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবি,
মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি!”
কোথা চেংগিস, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়?
ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া-দ্বার!
খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা?
সব দ্বার এর খোলা র’বে, চালা হাতুরি-শাবল চালা!

হায় রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড গাহে স্বার্থের জয়!
মানুষেরে ঘৃণা করি’
ও’ কা’রা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি’
ও’ মুখ হইতে কেতাব-গ্রন্থ নাও জোর ক’রে কেড়ে,
যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে।
পূজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো,
মানুষ এনেছে গ্রন্থ;---গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো!
আদম দাউদ ঈসা মূসা ইব্রাহিব মোহাম্মদ
কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর,---বিশ্বের সম্পদ,
আমাদেরি এঁরা পিতা পিতামহ, এই আমাদের মাঝে
তাঁদেরি রক্ত কম-বেশি ক’রে প্রতি ধমনীতে-রাজে।
আমরা তাঁদেরি সন্তান, জ্ঞাতি, তাঁদেরি মতন দেহ,
কে জানে কখন মোরাও অমনি হয়ে যেতে পারি কেহ।

হেসো না বন্ধু! আমার আমি সে কত অতল অসীম,
আমিই কি জানি কে জানে আছে আমাতে মহামহিম।
হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদি ঈসা,
কে জানে কাহার অন্ত ও আদি, কে পায় কাহার দিশা?
কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি?
হয়ত উহারই বুকে ভগবান জাগিছেন দিবারাতি!
অথবা হয়ত কিছুই নহে সে, মহান উচ্চ নহে,
আছে ক্লেদাক্ত ক্ষত-বিক্ষত পড়িয়া দুঃখ-দহে,
তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন্থ ভজনালয় 
ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয়!
হয়ত ইহারই ঔরসে ভাই ইহারই কুটির-বাসে
জন্মিছে কেহ--- জোড়া নাই যার জগতের ইতিহাসে!
যে বাণী আজিও শোনেনি জগৎ, যে মহাশক্তিধরে
আজিও বিশ্ব দেখেনি,---হয়ত আসিছে সে এরই ঘরে!

ও কে? চণ্ডাল? চমকাও কেন? নহে ও ঘৃণ্য জীব!
ওই হতে পারে হরিশ্চন্দ্র, ওই শ্মশানের শিব।
আজ চণ্ডাল কা’ল হ’তে পারে মহাযোগী-সম্রাট,
তুমি কাল তারে অর্ঘ্য দানিবে, করিবে নান্দী-পাঠ।
রাখাল বলিয়া কারে কর হেলা,ও-হেলা কাহারে বাজে!
হয়ত গোপনে ব্রজের গোপাল এসেছে রাখাল-সাজে!
চাষা ব’লে কর ঘৃণা!
দে’খো চাষা-রুপে লুকায়ে জনক বলরাম এলো কি না!
যত নবী ছিল মেষের রাখাল, তারাও ধরিল হাল,
তারাই আনিল অমর বাণী---যা আছে র’বে চিরকাল।
দ্বারে গালি খেয়ে ফিরে যায় নিতি ভিখারি-ভিখারিনী,
তারি মাঝে কবে এলো ভোলা-নাথ গিরিজায়া, তা কি চিনি!
তোমার ভোগের হ্রাস হয় পাছে ভিক্ষা মুষ্ঠি-দিলে,
দ্বারী দিয়ে তাই মার দিয়ে তুমি দেবতারে খেদাইলে।

সে মার রহিল জমা---
কে জানে তোমায় লাঞ্ছিতা দেবী করিয়াছে কি না ক্ষমা!
বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ দু’চোখে স্বার্থ-ঠুলি,
নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হয়েছে কুলি।
মানুষের বুকে যেটুকু দেবতা, বেদনা-মথিত-সুধা,
তাই লুটে তুমি খাবে পশু? তুমি তা দিয়ে মিটাবে ক্ষুধা?
তোমার ক্ষুধার আহার তোমার মন্দোদরীই জানে
তোমার মৃত্যু-বাণ আছে তব প্রাসাদের কোনখানে!
তোমারে কামনা-রানী
যুগে যুগে, পশু, ফেলেছে তোমায় মৃত্যু-বিবরে টানি’।

Monday, 18 March 2019

কাজি নজরুল ইসলামের কবিতা -- আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে

আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে
কাজি নজরুল ইসলাম

আজ     সৃষ্টি সুখের উল্লাসে–

মোর     মুখ হাসে মোর চোখ হাসে মোর টগবগিয়ে খুন হাসে
                আজ     সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে।

    আজকে আমার রুদ্ধ প্রাণের পল্বলে -

বান ডেকে ঐ জাগল জোয়ার দুয়ার – ভাঙা কল্লোলে।
                        আসল হাসি, আসল কাঁদন
                        মুক্তি এলো, আসল বাঁধন,
মুখ ফুটে আজ বুক ফাটে মোর তিক্ত দুখের সুখ আসে।
            ঐ         রিক্ত বুকের দুখ আসে -
            আজ       সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে!


                        আসল উদাস, শ্বসল হুতাশ

                        সৃষ্টি-ছাড়া বুক-ফাটা শ্বাস, ফুললো সাগর দুললো আকাশ ছুটলো বাতাস,
গগন ফেটে চক্র ছোটে, পিণাক-পাণির শূল আসে!
                        ঐ     ধূমকেতু আর উল্কাতে
                        চায়     সৃষ্টিটাকে উল্টাতে,

আজ তাই দেখি আর বক্ষে আমার লক্ষ বাগের ফুল হাসে

                        আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে!

              আজ     হাসল আগুন, শ্বসল ফাগুন,
                        মদন মারে খুন-মাখা তূণ
                        পলাশ অশোক শিমুল ঘায়েল
                        ফাগ লাগে ঐ দিক-বাসে
               গো     দিগ বালিকার পীতবাসে;

আজ     রঙ্গন এলো রক্তপ্রাণের অঙ্গনে মোর চারপাশে

                আজ     সৃষ্টি সুখের উল্লাসে!
                আজ     কপট কোপের তূণ ধরি,
                ঐ       আসল যত সুন্দরী,
    কারুর পায়ে বুক ডলা খুন, কেউ বা আগুন,
            কেউ মানিনী চোখের জলে বুক ভাসে!
তাদের প্রাণের ‘বুক-ফাটে-তাও-মুখ-ফোটে-না’ বাণীর বীণা মোর পাশে
            ঐ    তাদের কথা শোনাই তাদের
                    আমার চোখে জল আসে
            আজ   সৃষ্টি সুখের উল্লাসে!

            আজ     আসল ঊষা, সন্ধ্যা, দুপুর,

                      আসল নিকট, আসল সুদূর
                      আসল বাধা-বন্ধ-হারা ছন্দ-মাতন
                      পাগলা-গাজন-উচ্ছ্বাসে!
             ঐ      আসল আশিন শিউলি শিথিল
                      হাসল শিশির দুবঘাসে
            আজ     সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে!

            আজ     জাগল সাগর, হাসল মরু

                      কাঁপল ভূধর, কানন তরু
      বিশ্ব-ডুবান আসল তুফান, উছলে উজান
                      ভৈরবীদের গান ভাসে,
মোর ডাইনে শিশু সদ্যোজাত জরায়-মরা বামপাশে।

মন ছুটছে গো আজ বল্গাহারা অশ্ব যেন পাগলা সে।

                আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে!
                আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে!!

Saturday, 16 March 2019

কাজি নজরুল ইসলামের কবিতা -- লিচুচোর

লিচুচোর
কাজি নজরুল ইসলাম

বাবুদের তাল-পুকুরে

হাবুদের ডাল-কুকুরে
সে কি বাস করলে তাড়া,
বলি থাম একটু দাঁড়া।

পুকুরের ঐ কাছে না

লিচুর এক গাছ আছে না
হোথা না আস্তে গিয়ে 
য়্যাব্বড় কাস্তে নিয়ে
গাছে গো যেই চড়েছি
ছোট এক ডাল ধরেছি,

ও বাবা মড়াত করে

পড়েছি সরাত জোরে।
পড়বি পড় মালীর ঘাড়েই,
সে ছিল গাছের আড়েই।
ব্যাটা ভাই বড় নচ্ছার,
ধুমাধুম গোটা দুচ্চার
দিলে খুব কিল ও ঘুষি
একদম জোরসে ঠুসি।

আমিও বাগিয়ে থাপড়

দে হাওয়া চাপিয়ে কাপড়
লাফিয়ে ডিঙনু দেয়াল,
দেখি এক ভিটরে শেয়াল!
ও বাবা শেয়াল কোথা
ভেলোটা দাড়িয়ে হোথা
দেখে যেই আঁতকে ওঠা
কুকুরও জুড়লে ছোটা!
আমি কই কম্ম কাবার
কুকুরেই করবে সাবাড়!

‘বাবা গো মা গো’ বলে

পাঁচিলের ফোঁকল গলে
ঢুকি গিয়ে বোসদের ঘরে,
যেন প্রাণ আসলো ধড়ে!

যাব ফের? কান মলি ভাই,

চুরিতে আর যদি যাই!
তবে মোর নামই মিছা!
কুকুরের চামড়া খিঁচা
সেকি ভাই যায় রে ভুলা-
মালীর ঐ পিটুনিগুলা!
কি বলিস? ফের হপ্তা!
তৌবা-নাক খপ্তা!

Monday, 11 March 2019

কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ---ভোর হল দোর খোলো

ভোর হল দোর খোলো
কাজী নজরুল ইসলাম


ভোর হলো দোর খোলো
খুকুমণি ওঠ রে!
ঐ ডাকে যুঁই-শাখে
ফুল-খুকি ছোটরে!

রবি মামা দেয় হামা
গায়ে রাঙা জামা ঐ,
দারোয়ান গায় গান
শোন ঐ, রামা হৈ!' 

ত্যাজি নীড় করে ভিড়
ওড়ে পাখি আকাশে
এন্তার গান তার
ভাসে ভোর বাতাসে।

চুলবুল বুলবুল
শিস্ দেয় পুষ্পে,
এইবার এইবার
খুকুমণি উঠবে!

খুলি হাল তুলি পাল
ঐ তরী চললো,
এইবার এইবার
খুকু চোখ খুললো।

আলসে নয় সে
ওঠে রোজ সকালে
রোজ তাই চাঁদা ভাই
টিপ দেয় কপালে। 

উঠলো ছুটলো ওই
খোকা খুকি সব,
''উঠেছে আগে কে''
ঐ শোনো কলরব।
নাই রাত মুখ হাত
ধোও, খুকু জাগো রে!
জয়গানে ভগবানে
তুষি' বর মাগো রে। 

Wednesday, 20 February 2019

খুকী ও কাঠবেড়ালি

খুকী ও কাঠবেড়ালি

কাঠবেড়ালি! কাঠবেড়ালি! পেয়ারা তুমি খাও?
গুড়-মুড়ি খাও? দুধ-ভাত খাও? বাতাবি-নেবু? লাউ?
বেড়াল-বাচ্চা? কুকুর-ছানা? তাও-
ডাইনি তুমি হোঁৎকা পেটুক,
খাও একা পাও যেথায় যেটুক!
বাতাবি-নেবু সকলগুলো
একলা খেলে ডুবিয়ে নুলো!
তবে যে ভারি ল্যাজ উঁচিয়ে পুটুস পাটুস চাও?
ছোঁচা তুমি! তোমার সঙ্গে আড়ি আমার! যাও!

কাঠবেড়ালি! বাঁদরীমুখী! মারবো ছুঁড়ে কিল?
দেখবি তবে? রাঙাদাকে ডাকবো? দেবে ঢিল!
পেয়ারা দেবে? যা তুই ওঁচা!
তাই তোর নাকটি বোঁচা!
হুতমো-চোখী! গাপুস গুপুস
একলাই খাও হাপুস হুপুস!
পেটে তোমার পিলে হবে! কুড়ি-কুষ্টি মুখে!
হেই ভগবান! একটা পোকা যাস পেটে ওর ঢুকে!
ইস! খেয়ো না মস্তপানা ঐ সে পাকাটাও!
আমিও খুবই পেয়ারা খাই যে! একটি আমায় দাও!

কাঠবেড়ালি! তুমি আমার ছোড়দি’ হবে? বৌদি হবে? হুঁ!
রাঙা দিদি? তবে একটা পেয়ারা দাও না! উঃ!
এ রাম! তুমি ন্যাংটা পুঁটো?
ফ্রকটা নেবে? জামা দুটো?
আর খেয়ো না পেয়ার তবে,
বাতাবি-নেবুও ছাড়তে হবে!
দাঁত দেখিয়ে দিচ্ছ যে ছুট? অ’মা দেখে যাও!-
কাঠবেড়ালি! তুমি মর! তুমি কচু খাও!!