Saturday, 13 June 2026

মেঘের পাড়ে -- শিপ্রা

মেঘের পাড়ে 
শিপ্রা 



আয় কাছে আয় দেখবি যদি
নীল আকাশ আর ইচ্ছে নদী
একসাথে আজ মিশে ---
কোন পথে যে চলবে ধেয়ে
সাদা মেঘের পানসি বেয়ে
পায় না কোনো দিশে ।

চারিদিকে অপরূপ সাজ
হারানো সেই মনটাকে আজ
চল না এবার খুঁজি ---
আকাশ পাড়ে নদীর ধারে
খুঁজে ফিরি বারে বারে
কত গলি - ঘুঁজি ।

আকাশ পথে চলি উড়ে ,
বাঁধি আমার ছোট্ট কুঁড়ে
মাতি আপন খেলায় ---
লুকোচুরির সঙ্গী যে হই ,
দলছুটেরও সঙ্গেতে রই
রঙীন মেঘের ভেলায় ।

দিন শেষে যেই সন্ধ্যা নামে ,
আকাশজুড়ে বিরাট খামে
হাজার তারার আলো ,
দুঃখটাকে আড়াল করে ,
রাতের রঙীন তারা ধরে
মুছব সকল কালো ।

Friday, 12 June 2026

বন্দেমাতরম্ -- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

 বন্দেমাতরম্

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় 


বন্দে মাতরম্!

সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাম্
শস্যশ্যামলাং মাতরম্!
শুভ্র-জ্যোৎস্না-পুলকিত-যামিনীম্
ফুল্লকুসুমিত-দ্রুমদলশোভিনীম্
সুহাসিনীং সুমধুরভাষিণীম্
সুখদাং বরদাং মাতরম্!
কোটি-কোটি-কণ্ঠ-কলকল-নিনাদ-করালে
কোটি-কোটি-ভুজৈর্ধৃত-খর-করবালে
অবলা কেন মা এতো বলে
বহুবলধারিণীং নমামি তারিণীং
রিপুদলবারিণীং মাতরম্!
তুমি বিদ্যা তুমি ধর্ম, তুমি হৃদি তুমি মর্ম
ত্বং হি প্রাণাঃ শরীরে
বাহুতে তুমি মা শক্তি, হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি
তোমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে॥
ত্বং হি দুর্গা দশহরণ-ধারিণী
কমলা কমলদলবিহারিণী
বাণী বিদ্যাদায়িনী, নমামি ত্বাং
নমামি কমলাং অমলাং অতুলাং
সুজলাং সুফলাং মাতরম্!
বন্দে মাতরম্!
শ্যামলাং সরলাং সুস্মিতাং ভূষিতাং
ধরণীং ভরণীং মাতরম্!

একুশের কবিতা – আল মাহমুদ

 

একুশের কবিতা 

 আল মাহমুদ

ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ
দুপুর বেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায় ?
বরকতের রক্ত।

হাজার যুগের সূর্যতাপে
জ্বলবে এমন লাল যে,
সেই লোহিতেই লাল হয়েছে
কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে !

প্রভাতফেরীর মিছিল যাবে
ছড়াও ফুলের বন্যা
বিষাদগীতি গাইছে পথে
তিতুমীরের কন্যা।

চিনতে না কি সোনার ছেলে
ক্ষুদিরামকে চিনতে ?
রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিলো যে
মুক্ত বাতাস কিনতে ?

পাহাড়তলীর মরণ চূড়ায়
ঝাঁপ দিল যে অগ্নি,
ফেব্রুয়ারির শোকের বসন
পরলো তারই ভগ্নী।

প্রভাতফেরী, প্রভাতফেরী
আমায় নেবে সঙ্গে,
বাংলা আমার বচন, আমি
জন্মেছি এই বঙ্গে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- আষাঢ়

আষাঢ়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে।
ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে। 
বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর, 
আউশের ক্ষেত জলে ভরভর, 
কালি-মাখা মেঘে ও পারে আঁধার ঘনিছে দেখ্ চাহি রে। 
ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।।


ওই ডাকে শোনো ধেনু ঘনঘন, ধবলীরে আনো গোহালে। 
এখনি আঁধার হবে বেলাটুকু পোহালে। 
দুয়ারে দাঁড়ায়ে ওগো দেখ্ দেখি 
মাঠে গেছে যারা তারা ফিরিছে কি, 
রাখালবালক কী জানি কোথায় সারা দিন আজি খোয়ালে। 
এখনি আঁধার হবে বেলাটুকু পোহালে।।


শোনো শোনো ওই পারে যাবে বলে কে ডাকিছে বুঝি মাঝিরে। 
খেয়া-পারাপার বন্ধ হয়েছে আজি রে। 
পুবে হাওয়া বয়, কূলে নেই কেউ, 
দু কূল বাহিয়া উঠে পড়ে ঢেউ, 
দরদর বেগে জলে পড়ি জল ছলছল উঠে বাজি রে। 
খেয়া-পারাপার বন্ধ হয়েছে আজি রে।।
ওগো, আজ তোরা যাস নে গো, তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে। 


আকাশ আঁধার, বেলা বেশি আর নাহি রে। 
ঝরঝর ধারে ভিজিবে নিচোল, 
ঘাটে যেতে পথ হয়েছে পিছল, 
ওই বেণুবন দুলে ঘনঘন পথপাশে দেখ্ চাহি রে। 
ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।।


Thursday, 11 June 2026

বাংলাটা ঠিক আসে না! – ভবানীপ্রসাদ মজুমদার

ছেলে আমার খুব ‘সিরিয়াস’ কথায়-কথায় হাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।
ইংলিশে ও ‘রাইমস’ বলে
‘ডিবেট’ করে, পড়াও চলে
আমার ছেলে খুব ‘পজেটিভ’ অলীক স্বপ্নে ভাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।

‘ইংলিশ’ ওর গুলে খাওয়া, ওটাই ‘ফাস্ট’ ল্যাঙ্গুয়েজ
হিন্দি সেকেন্ড, সত্যি বলছি, হিন্দিতে ওর দারুণ তেজ।
কী লাভ বলুন বাংলা প’ড়ে?
বিমান ছেড়ে ঠেলায় চড়ে?
বেঙ্গলি ‘থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ’ তাই, তেমন ভালোবাসে না
জানে দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।

বাংলা আবার ভাষা নাকি, নেই কোনও ‘চার্ম’ বেঙ্গলিতে
সহজ-সরল এই কথাটা লজ্জা কীসের মেনে নিতে?
ইংলিশ ভেরি ফ্যান্টাসটিক
হিন্দি সুইট সায়েন্টিফিক
বেঙ্গলি ইজ গ্ল্যামারলেস, ওর ‘প্লেস’ এদের পাশে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।

বাংলা যেন কেমন-কেমন, খুউব দুর্বল প্যানপ্যানে
শুনলে বেশি গা জ্ব’লে যায়, একঘেয়ে আর ঘ্যানঘ্যানে।
কীসের গরব? কীসের আশা?
আর চলে না বাংলা ভাষা
কবে যেন হয় ‘বেঙ্গলি ডে’, ফেব্রুয়ারি মাসে না?
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।

ইংলিশ বেশ বোমবাস্টিং শব্দে ঠাসা দারুণ ভাষা
বেঙ্গলি ইজ ডিসগাস্টিং, ডিসগাস্টিং সর্বনাশা।
এই ভাষাতে দিবানিশি
হয় শুধু ভাই ‘পি.এন.পি.সি’
এই ভাষা তাই হলেও দিশি, সবাই ভালোবাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।

বাংলা ভাষা নিয়েই নাকি এংলা-প্যাংলা সবাই মুগ্ধ
বাংলা যাদের মাতৃভাষা, বাংলা যাদের মাতৃদুগ্ধ
মায়ের দুধের বড়ই অভাব
কৌটোর দুধ খাওয়াই স্বভাব
ওই দুধে তেজ-তাকত হয় না, বাংলাও তাই হাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।

বিদেশে কী বাংলা চলে? কেউ বোঝে না বাংলা কথা
বাংলা নিয়ে বড়াই করার চেয়েও ভালো নিরবতা।
আজ ইংলিশ বিশ্বভাষা
বাংলা ফিনিশ, নিঃস্ব আশা
বাংলা নিয়ে আজকাল কেউ সুখের স্বর্গে ভাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।

শেক্সপীয়র, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, শেলী বা কীটস বা বায়রন
ভাষা ওদের কী বলিষ্ঠ, শক্ত-সবল যেন আয়রন
কাজী নজরুল- রবীন্দ্রনাথ
ওদের কাছে তুচ্ছ নেহাত
মাইকেল হেরে বাংলায় ফেরে, আবেগে-উচ্ছ্বাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসেনা।