Friday, 12 June 2026

বন্দেমাতরম্ -- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

 বন্দেমাতরম্

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় 


বন্দে মাতরম্!

সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাম্
শস্যশ্যামলাং মাতরম্!
শুভ্র-জ্যোৎস্না-পুলকিত-যামিনীম্
ফুল্লকুসুমিত-দ্রুমদলশোভিনীম্
সুহাসিনীং সুমধুরভাষিণীম্
সুখদাং বরদাং মাতরম্!
কোটি-কোটি-কণ্ঠ-কলকল-নিনাদ-করালে
কোটি-কোটি-ভুজৈর্ধৃত-খর-করবালে
অবলা কেন মা এতো বলে
বহুবলধারিণীং নমামি তারিণীং
রিপুদলবারিণীং মাতরম্!
তুমি বিদ্যা তুমি ধর্ম, তুমি হৃদি তুমি মর্ম
ত্বং হি প্রাণাঃ শরীরে
বাহুতে তুমি মা শক্তি, হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি
তোমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে॥
ত্বং হি দুর্গা দশহরণ-ধারিণী
কমলা কমলদলবিহারিণী
বাণী বিদ্যাদায়িনী, নমামি ত্বাং
নমামি কমলাং অমলাং অতুলাং
সুজলাং সুফলাং মাতরম্!
বন্দে মাতরম্!
শ্যামলাং সরলাং সুস্মিতাং ভূষিতাং
ধরণীং ভরণীং মাতরম্!

একুশের কবিতা – আল মাহমুদ

 

একুশের কবিতা 

 আল মাহমুদ

ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ
দুপুর বেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায় ?
বরকতের রক্ত।

হাজার যুগের সূর্যতাপে
জ্বলবে এমন লাল যে,
সেই লোহিতেই লাল হয়েছে
কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে !

প্রভাতফেরীর মিছিল যাবে
ছড়াও ফুলের বন্যা
বিষাদগীতি গাইছে পথে
তিতুমীরের কন্যা।

চিনতে না কি সোনার ছেলে
ক্ষুদিরামকে চিনতে ?
রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিলো যে
মুক্ত বাতাস কিনতে ?

পাহাড়তলীর মরণ চূড়ায়
ঝাঁপ দিল যে অগ্নি,
ফেব্রুয়ারির শোকের বসন
পরলো তারই ভগ্নী।

প্রভাতফেরী, প্রভাতফেরী
আমায় নেবে সঙ্গে,
বাংলা আমার বচন, আমি
জন্মেছি এই বঙ্গে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- আষাঢ়

আষাঢ়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে।
ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে। 
বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর, 
আউশের ক্ষেত জলে ভরভর, 
কালি-মাখা মেঘে ও পারে আঁধার ঘনিছে দেখ্ চাহি রে। 
ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।।


ওই ডাকে শোনো ধেনু ঘনঘন, ধবলীরে আনো গোহালে। 
এখনি আঁধার হবে বেলাটুকু পোহালে। 
দুয়ারে দাঁড়ায়ে ওগো দেখ্ দেখি 
মাঠে গেছে যারা তারা ফিরিছে কি, 
রাখালবালক কী জানি কোথায় সারা দিন আজি খোয়ালে। 
এখনি আঁধার হবে বেলাটুকু পোহালে।।


শোনো শোনো ওই পারে যাবে বলে কে ডাকিছে বুঝি মাঝিরে। 
খেয়া-পারাপার বন্ধ হয়েছে আজি রে। 
পুবে হাওয়া বয়, কূলে নেই কেউ, 
দু কূল বাহিয়া উঠে পড়ে ঢেউ, 
দরদর বেগে জলে পড়ি জল ছলছল উঠে বাজি রে। 
খেয়া-পারাপার বন্ধ হয়েছে আজি রে।।
ওগো, আজ তোরা যাস নে গো, তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে। 


আকাশ আঁধার, বেলা বেশি আর নাহি রে। 
ঝরঝর ধারে ভিজিবে নিচোল, 
ঘাটে যেতে পথ হয়েছে পিছল, 
ওই বেণুবন দুলে ঘনঘন পথপাশে দেখ্ চাহি রে। 
ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।।


Thursday, 11 June 2026

বাংলাটা ঠিক আসে না! – ভবানীপ্রসাদ মজুমদার

ছেলে আমার খুব ‘সিরিয়াস’ কথায়-কথায় হাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।
ইংলিশে ও ‘রাইমস’ বলে
‘ডিবেট’ করে, পড়াও চলে
আমার ছেলে খুব ‘পজেটিভ’ অলীক স্বপ্নে ভাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।

‘ইংলিশ’ ওর গুলে খাওয়া, ওটাই ‘ফাস্ট’ ল্যাঙ্গুয়েজ
হিন্দি সেকেন্ড, সত্যি বলছি, হিন্দিতে ওর দারুণ তেজ।
কী লাভ বলুন বাংলা প’ড়ে?
বিমান ছেড়ে ঠেলায় চড়ে?
বেঙ্গলি ‘থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ’ তাই, তেমন ভালোবাসে না
জানে দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।

বাংলা আবার ভাষা নাকি, নেই কোনও ‘চার্ম’ বেঙ্গলিতে
সহজ-সরল এই কথাটা লজ্জা কীসের মেনে নিতে?
ইংলিশ ভেরি ফ্যান্টাসটিক
হিন্দি সুইট সায়েন্টিফিক
বেঙ্গলি ইজ গ্ল্যামারলেস, ওর ‘প্লেস’ এদের পাশে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।

বাংলা যেন কেমন-কেমন, খুউব দুর্বল প্যানপ্যানে
শুনলে বেশি গা জ্ব’লে যায়, একঘেয়ে আর ঘ্যানঘ্যানে।
কীসের গরব? কীসের আশা?
আর চলে না বাংলা ভাষা
কবে যেন হয় ‘বেঙ্গলি ডে’, ফেব্রুয়ারি মাসে না?
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।

ইংলিশ বেশ বোমবাস্টিং শব্দে ঠাসা দারুণ ভাষা
বেঙ্গলি ইজ ডিসগাস্টিং, ডিসগাস্টিং সর্বনাশা।
এই ভাষাতে দিবানিশি
হয় শুধু ভাই ‘পি.এন.পি.সি’
এই ভাষা তাই হলেও দিশি, সবাই ভালোবাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।

বাংলা ভাষা নিয়েই নাকি এংলা-প্যাংলা সবাই মুগ্ধ
বাংলা যাদের মাতৃভাষা, বাংলা যাদের মাতৃদুগ্ধ
মায়ের দুধের বড়ই অভাব
কৌটোর দুধ খাওয়াই স্বভাব
ওই দুধে তেজ-তাকত হয় না, বাংলাও তাই হাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।

বিদেশে কী বাংলা চলে? কেউ বোঝে না বাংলা কথা
বাংলা নিয়ে বড়াই করার চেয়েও ভালো নিরবতা।
আজ ইংলিশ বিশ্বভাষা
বাংলা ফিনিশ, নিঃস্ব আশা
বাংলা নিয়ে আজকাল কেউ সুখের স্বর্গে ভাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।

শেক্সপীয়র, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, শেলী বা কীটস বা বায়রন
ভাষা ওদের কী বলিষ্ঠ, শক্ত-সবল যেন আয়রন
কাজী নজরুল- রবীন্দ্রনাথ
ওদের কাছে তুচ্ছ নেহাত
মাইকেল হেরে বাংলায় ফেরে, আবেগে-উচ্ছ্বাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসেনা।

Friday, 10 October 2025

শব্দের অহংকার -- রামকৃষ্ণ পাল


শব্দের অহংকার
রামকৃষ্ণ পাল 
১০/১০/২০২৫

নিস্তব্ধ জগৎ অপরিচিত মহল 
শব্দে প্রাণের কথা, 
নিস্তব্ধ রাতে অন্ধকারে জ্বলে 
না বলা কত ব্যথা।

আকাশ ফাটা শব্দের অহংকার 
অভিনয়ের ফুলদানি, 
ভীত দর্শক, করতালিতে উল্লাস 
নিজেই জুড়ে বাখানি।

মহাপাতকের শব্দ বাণীর স্রোত 
বইছে আপন মনে,
এই শব্দ বোমার আগুনে পুড়ে 
কত নিষ্পাপ জনে। 

শব্দেই হাসি, শব্দেই কান্না, গান 
কাব্য ঝংকার, লহরী
নিঃশব্দতার দুঃস্বপ্নে ভরা জীবন 
জীবন্ত, ডুবন্ত তরী ।

কত শব্দে প্রেমের গাঁথা বন্ধন 
ভালোবাসার ছন্দে,
কত অলি উড়ে এসে সশব্দে
জুড়ে গান আনন্দে। 

শব্দবিনা বীণা বাজে কি কখনো?-
নিঃশব্দতাই মরণ, 
এই শব্দেই রচিত হয়েছিল বেদ 
জীবনের প্রতিটি চরণ।

Saturday, 6 July 2024

গোপনে -- দেবাশীষ চ্যাটার্জী

 গোপনে 
 দেবাশীষ চ্যাটার্জী 
03/07/2024 
-------------------------------------
ভালো আছি বলি প্রশ্নের কাছে  
উত্তরেরা তাই খুশি 
ভালো থাকাটা অভিনয় শুধু  
জমা ক্ষোভ  রাশি রাশি |

বুকে জমা যত অভিমান সবই 
গোপনে গুমরে কাঁদে 
মনের দুয়ার হাট করে খুলে 
সে কথা বলি আর কাকে  ?

সব-ই সবার ভাগ্যে থাকেনা 
কিছুটা রহস্যে ঘেরা 
পাওয়া না পাওয়ার দোলায় দুলেছে
জীবন আজ দিশেহারা  |

পথ হারিয়ে বেপথে চলেছে 
পথিক আজ  শত শত
সবার মুখেতে মুখোশের হাসি
বুকে জমা শুধু ক্ষত |

হাসি মুখে আজ বিষের বাঁশরী  
হলাহলে ভরা মনের দ্বার 
হৃদয়পুরে বসবাস করে   
হিংসুটে এক অহংকার |

বৃষ্টি এলো ঝেঁপে -- নিকাশ মালিক

 বৃষ্টি এলো ঝেঁপে 
  নিকাশ মালিক 
   ০৫/০৭/২০২৪

সূর্য ঢেকে আঁধার আসে 
বাদল হয়েছে শুরু,
ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ে 
মেঘ করে গুরু গুরু।

সারাটা দিন মেঘলা আকাশ 
বৃষ্টি স্রোতে স্রোতে,
এমন দিনে মন ছুঁটে যায় 
একটুখানি ভিজতে।

গাছের পাতা হাওয়ায় নাচে
খুশির জোয়ারে,
হাঁসগুলো চেঁচামেচি 
 করে পুকুরে।

সাদা সাদা বক গুলো 
আকাশেতে উড়ে,
 মাছরাঙা মাছের নেশায় 
পুকুর ধারে ঘুরে।

চাঁদের দেখা পাবে না আজ
কালো মেঘের জন্য,
পেয়েছে প্রাণ এই বৃষ্টিতে 
শুকিয়ে যাওয়া অরণ্য ।

স্বভাব দোষ -- দিলীপ ঘোষ

স্বভাব দোষ
দিলীপ ঘোষ
০৩/০৭/২৪
নিজেকে কষ্টি পাথরে ফেলে দেখতে না শিখলে
আয়নায় নিজের মুখ বারবার না দেখলে
নিজেকে ভুল ত্রুটির উর্দ্ধে রেখে এঁড়ে তর্ক করবে
উচিত কথার নামে অপরের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে
অতিমানব মনে করে কার্যত্ব নিজের দোষ ঢাকবে

গরু মরলে উপরওলা, ফুল গাছ পুতলে আমি
এমন আমিত্বের রোগ ধরা পড়ে
                ‌                কিছু মানুষের চাল চলনে
কম্পাসে ফেলে ভুল ধরতে পারে না তারা
আনাড়ির মত অপরের সমালোচনা করে

নীতির রেলে গাড়ি চালিয়ে দেখার অভ্যাস হারালে
পছন্দ অপছন্দের চোখে ঠিক ভুল দেখবে
যাকে না দেখতে পারো তাকে মুরগি করে
মনগড়া ছুরিতে কেটে সুপ্ত জ্বালা মেটাবে

আমার কোন ভুল নেই, ত্রুটি নেই
যাবতীয় অধঃপতন,-  এর ওর জন্য
যারা মনে করে প্রচার করে
তারা কখনোই নিজেকে করতে পারে না সংশোধন।

Saturday, 21 November 2020

সুকুমার রায়ের কবিতা - মেঘের খেয়াল

মেঘের খেয়াল
সুকুমার রায়


আকাশের ময়দানে বাতাসের ভরে, 
ছোট বড় সাদা কালো কত মেঘ চরে। 
কচি কচি থোপা থোপা মেঘেদের ছানা 
হেসে খেলে ভেসে যায় মেলে কচি ডানা। 
কোথা হতে কোথা যায় কোন্‌ তালে চলে, 
বাতাসের কানে কানে কত কথা বলে। 
বুড়ো বুড়ো ধাড়ি মেঘ ঢিপি হয়ে উঠে- 
শুয়ে ব'সে সভা করে সারাদিন জুটে। 
কি যে ভাবে চুপ্‌চাপ, কোন ধ্যানে থাকে, 
আকাশের গায়ে গায়ে কত ছবি আঁকে। 
কত আঁকে কত মোছে, কত মায়া করে, 
পলে পলে কত রং কত রূপ ধরে। 
জটাধারী বুনো মেঘ ফোঁস ফোঁস ফোলে, 
গুরুগুরু ডাক ছেড়ে কত ঝড় তোলে। 
ঝিলিকের ঝিকিমিকি চোখ করে কানা, 
হড়্‌ হড়্‌ কড়্‌ কড়্‌ দশদিকে হানা। 
ঝুল্‌ কালো চারিধার, আলো যায় ঘুচে, 
আকাশের যত নীল সব দেয় মুছে।

সুকুমার রায়ের কবিতা - হুঁকোমুখো হ্যাংলা

হুঁকোমুখো হ্যাংলা
সুকুমার রায়


হুঁকোমুখো হ্যাংলা বাড়ি তার বাংলা 
          মুখে তার হাসি নাই দেখেছ? 
নাই তার মানে কি?      কেউ তাহা জানে কি? 
          কেউ কভু তার কাছে থেকেছ? 

শ্যামাদাস মামা তার আফিঙের থানাদার, 
          আর তার কেহ নাই এ-ছাড়া - 
তাই বুঝি একা সে মুখখানা ফ্যাকাশে, 
          ব'সে আছে কাঁদ'-কাঁদ' বেচারা?

থপ্ থপ্ পায়ে সে নাচত যে আয়েসে, 
          গালভরা ছিল তার ফুর্তি, 
গাইতো সে সারা দিন 'সারে গামা টিমটিম্' 
          আহ্লাদে গদ-গদ মূর্তি। 

এই তো সে দুপ'রে বসে ওই উপরে, 
          খাচ্ছিল কাঁচকলা চটকে - 
এর মাঝে হল কি? মামা তার মোলো কি? 
          অথবা কি ঠ্যাং গেল মটকে? 

হুঁকোমুখো হেঁকে কয়, 'আরে দূর, তা তো নয়, 
          দেখছ না কিরকম চিন্তা? 
মাছি মারা ফন্দি এ যত ভাবি মন দিয়ে - 
          ভেবে ভেবে কেটে যায় দিনটা। 

বসে যদি ডাইনে, লেখে মোর আইনে - 
          এই ল্যাজে মাছি মারি ত্রস্ত; 
বামে যদি বসে তাও, নহি আমি পিছপাও, 
          এই ল্যাজে আছে তার অস্ত্র। 

যদি দেখি কোনো পাজি বসে ঠিক মাঝামাঝি 
          কি যে করি ভেবে নাহি পাই রে - 
ভেবে দ্যাখ একি দায় কোন্ ল্যাজে মারি তায় 
          দুটি বৈ ল্যাজ মোর নাই রে।