Friday, 14 June 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ----- আমি চঞ্চল হে

আমি চঞ্চল হে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমি চঞ্চল হে ,
আমি সুদূরের পিয়াসি ।
দিন চলে যায় , আমি আনমনে
তারি আশা চেয়ে থাকি বাতায়নে -------
ওগো , প্রাণে মনে আমি যে তাহার পরশ পাবার প্রয়াসি !
আমি সুদূরের পিয়াসি ।
সুদূর , বিপুল সুদূর , তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি -----
মোর ডানা নাই , আছি এক ঠাই , সে কথা যে যাই পাসরি ।।

আমি উন্মনা হে , 
হে সুদূর , আমি উদাসী ।
রৌদ্রমাখানো অলস বেলায়
তরুমর্মরে , ছায়ার খেলায় ,
কী মুরতি তব নীলাকাশশায়ী নয়নে উঠে গো আভাসি ।
হে সুদূর , আমি উদাসী ।
সুদূর , বিপুল সুদূর , তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি -----
কক্ষে আমার রুদ্ধ দুয়ার , সে কথা যে যাই পাসরি ।।

Tuesday, 11 June 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ----- আমি

আমি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ ,
চুনি উঠল রাঙা হয়ে ।
আমি চোখ মেললুম আকাশে -----
জ্বলে উঠল আলো
পুবে পশ্চিমে ।
গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম ' সুন্দর ' ,
সুন্দর হল সে ।

তুমি বলবে এ যে তত্ত্বকথা , এ কবির বাণী নয় ।
আমি বলব , এ সত্য ,
তাই এ কাব্য ।
এ আমার অহংকার ------
অহংকার সমস্ত মানুষের হয়ে ।
মানুষের অহংকার-পটেই
বিশ্বকর্মার বিশ্বশিল্প ।
তত্ত্বজ্ঞানী জপ করছেন নিশ্বাসে প্রশ্বাসে -----
না , না , না ----
না পান্না , না চুনি , না আলো , না গোলাপ ,
না আমি , না তুমি ।
ও দিকে , অসীম যিনি তিনি স্বয়ং করছেন সাধনা
মানুষের সীমানায় , 
তাকেই বলে ' আমি ' ।
সেই আমির গহনে আলো-আঁধারের ঘটল সংগম ,
দেখা দিল রূপ , জেগে উঠল রস ।
' না ' কখন ফুটে উঠে হল ' হাঁ ' , মায়ার মন্ত্রে ,
রেখায় রঙে , সুখে দুঃখে ।।

একে বোলো না তত্ত্ব ;
আমার মন হয়েছে পুলকিত
বিশ্ব- আমির রচনার আসরে
হাতে নিয়ে তুলি , পাত্রে নিয়ে রঙ ।।

পন্ডিত বলছেন ------
বুড়ো চন্দ্রটা , নিষ্ঠুর চতুর হাসি তার ,
মৃত্যুদূতের মত গুঁড়ি মেরে আসছে সে
পৃথিবীর পাঁজরের কাছে ।
একদিন দেবে চরম টান তার সাগরে পর্বতে ;
মর্তলোকে মহাকালের নূতন খাতায়
পাতা জুড়ে নামবে একটা শূন্য ,
গিলে ফেলবে দিনরাতের জমাখরচ ;
মানুষের কীর্তি হারাবে কমরতার ভান ,
তার ইতিহাসে লেপে দেবে
অনন্ত রাত্রির কালি ।
মানুষের যাবার দিনের চোখ
বিশ্ব থেকে নিকিয়ে নেবে রঙ ,
মানুষের যাবার দিনের মন
ছানিয়ে নেবে রস ।
শক্তির কম্পন চলবে আকাশে আকাশে ,
জ্বলবে না কোথাও আলো ।
বীণাহীন সভায় যন্ত্রীর আঙুল নাচবে ,
বাজবে না সুর ।
সেদিন কবিত্বহীন বিধাতা একা রবেন বসে
নীলিমাহীন আকাশে
ব্যক্তিত্বহারা অস্তিত্বের গনিততত্ত্ব নিয়ে ।
তখন বিরাট বিশ্বভুবনে
দূরে দূরান্তে অনন্ত অসংখ্যলোকে লোকান্তরে
এ বাণী ধ্বনিত হবে না কোনোখানেই -------
' তুমি সুন্দর '
' আমি ভালোবাসি ' ।
বিধাতা কি আবার বসবেন সাধনা করতে
যুগযুগান্তর ধরে ?
প্রলয়সন্ধ্যায় জপ করবেন ------
' কথা কও , কথা কও ' ,
বলবেন ' বলো , তুমি সুন্দর ' ,
বলবেন ' বলো , আমি ভালোবাসি ' ?

Tuesday, 4 June 2019

কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা --- মানুষ

মানুষ
কাজী নজরুল ইসলাম

গাহি সাম্যের গান—
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।–-

‘পূজারী, দুয়ার খোল,
ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পূজার সময় হলো!’
স্বপন দেখিয়ে আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়,
দেবতার বরে রাজা-টাজা আজ হয়ে যাবো নিশ্চয়!—
জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুধায় কন্ঠ ক্ষীণ
ডাকিল পান্থ, ‘দ্বার খোল বাবা, খাইনি ক’ সাত দিন।
সহসা বন্ধ হ’ল মন্দির, ভুখারি ফিরিয়া চলে,
তিমির রাত্রি, পথ জুরে তার ক্ষুধার মানিক জ্বলে!
ভুখারি ফুকারি কয়,
ঐ মন্দির পূজারীর, হায় দেবতা, তোমার নয়!

মসজিদে কাল শিরনি আছিল, অঢেল গোস্ত-রুটি
বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটিকুটি!
এমন সময় এল মুসাফির গায়ে আজারির চিন,
বলে, ‘বাবা, আমি ভুখা-ফাখা আছি আজ নিয়ে সাত দিন!’
তেরিয়াঁ হইয়া হাকিল মোল্লা---“ভ্যালা হ’ল দেখি লেঠা,
ভুখা আছ মর গো-ভাগারে গিয়ে! নামাজ পড়িস বেটা?”
ভুখারি কহিল, “না বাবা!” মোল্লা হাঁকিল,---“তা’ হলে শালা,
সোজা পথ দেখ!” গোস্ত-রুটি নিয়া মসজিদে দিল তালা!

ভখারি ফিরিয়া চলে,
চলিতে চলিতে বলে---
“আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু,
আমার ক্ষুধার অন্ন তা’বলে বন্ধ করোনি প্রভু,
তব মসজিদ-মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবি,
মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি!”
কোথা চেংগিস, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়?
ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া-দ্বার!
খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা?
সব দ্বার এর খোলা র’বে, চালা হাতুরি-শাবল চালা!

হায় রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড গাহে স্বার্থের জয়!
মানুষেরে ঘৃণা করি’
ও’ কা’রা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি’
ও’ মুখ হইতে কেতাব-গ্রন্থ নাও জোর ক’রে কেড়ে,
যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে।
পূজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো,
মানুষ এনেছে গ্রন্থ;---গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো!
আদম দাউদ ঈসা মূসা ইব্রাহিব মোহাম্মদ
কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর,---বিশ্বের সম্পদ,
আমাদেরি এঁরা পিতা পিতামহ, এই আমাদের মাঝে
তাঁদেরি রক্ত কম-বেশি ক’রে প্রতি ধমনীতে-রাজে।
আমরা তাঁদেরি সন্তান, জ্ঞাতি, তাঁদেরি মতন দেহ,
কে জানে কখন মোরাও অমনি হয়ে যেতে পারি কেহ।

হেসো না বন্ধু! আমার আমি সে কত অতল অসীম,
আমিই কি জানি কে জানে আছে আমাতে মহামহিম।
হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদি ঈসা,
কে জানে কাহার অন্ত ও আদি, কে পায় কাহার দিশা?
কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি?
হয়ত উহারই বুকে ভগবান জাগিছেন দিবারাতি!
অথবা হয়ত কিছুই নহে সে, মহান উচ্চ নহে,
আছে ক্লেদাক্ত ক্ষত-বিক্ষত পড়িয়া দুঃখ-দহে,
তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন্থ ভজনালয় 
ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয়!
হয়ত ইহারই ঔরসে ভাই ইহারই কুটির-বাসে
জন্মিছে কেহ--- জোড়া নাই যার জগতের ইতিহাসে!
যে বাণী আজিও শোনেনি জগৎ, যে মহাশক্তিধরে
আজিও বিশ্ব দেখেনি,---হয়ত আসিছে সে এরই ঘরে!

ও কে? চণ্ডাল? চমকাও কেন? নহে ও ঘৃণ্য জীব!
ওই হতে পারে হরিশ্চন্দ্র, ওই শ্মশানের শিব।
আজ চণ্ডাল কা’ল হ’তে পারে মহাযোগী-সম্রাট,
তুমি কাল তারে অর্ঘ্য দানিবে, করিবে নান্দী-পাঠ।
রাখাল বলিয়া কারে কর হেলা,ও-হেলা কাহারে বাজে!
হয়ত গোপনে ব্রজের গোপাল এসেছে রাখাল-সাজে!
চাষা ব’লে কর ঘৃণা!
দে’খো চাষা-রুপে লুকায়ে জনক বলরাম এলো কি না!
যত নবী ছিল মেষের রাখাল, তারাও ধরিল হাল,
তারাই আনিল অমর বাণী---যা আছে র’বে চিরকাল।
দ্বারে গালি খেয়ে ফিরে যায় নিতি ভিখারি-ভিখারিনী,
তারি মাঝে কবে এলো ভোলা-নাথ গিরিজায়া, তা কি চিনি!
তোমার ভোগের হ্রাস হয় পাছে ভিক্ষা মুষ্ঠি-দিলে,
দ্বারী দিয়ে তাই মার দিয়ে তুমি দেবতারে খেদাইলে।

সে মার রহিল জমা---
কে জানে তোমায় লাঞ্ছিতা দেবী করিয়াছে কি না ক্ষমা!
বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ দু’চোখে স্বার্থ-ঠুলি,
নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হয়েছে কুলি।
মানুষের বুকে যেটুকু দেবতা, বেদনা-মথিত-সুধা,
তাই লুটে তুমি খাবে পশু? তুমি তা দিয়ে মিটাবে ক্ষুধা?
তোমার ক্ষুধার আহার তোমার মন্দোদরীই জানে
তোমার মৃত্যু-বাণ আছে তব প্রাসাদের কোনখানে!
তোমারে কামনা-রানী
যুগে যুগে, পশু, ফেলেছে তোমায় মৃত্যু-বিবরে টানি’।

Friday, 31 May 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা - সবুজের অভিযান

ওরে নবীন , ওরে আমার কাঁচা ,
ওরে সবুজ , ওরে অবুঝ ,
আধ-মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা ।
রক্ত আলোর মদে মাতাল ভোরে ,
আজকে যে যা বলে বলুক তোরে ,
সকল তর্ক হেলায় তুচ্ছ করে
পুচ্ছটি তোর উচ্চে তুলে নাচা ।
আয় দুরন্ত , আয়রে আমার কাঁচা ।।

খাঁচাখানা দুলছে মৃদু হাওয়ায় ;
আর তো কিছুই নড়ে না রে
ওদের ঘরে , ওদের ঘরের দাওয়ায় ।
ওই যে প্রবীন , ওই যে পরম পাকা -----
চক্ষুকর্ণ দুইটি ডানায় ঢাকা ,
ঝিমায় যেন চিত্রপটে আঁকা
অন্ধকারে বন্ধ করা খাঁচায় ।
আয় জীবন্ত , আয়রে আমার কাঁচা ।।

বাহির পানে তাকায় না যে কেউ ,
দেখে না যে বান ডেকেছে -----
জোয়ার-জলে উঠছে প্রবল ঢেউ ।
চলতে ওরা চায়না মাটির ছেলে
মাটির পরে চরণ ফেলে ফেলে ,
আছে অচল আসনখানা মেলে
যে যার আপন উচ্চ বাঁশের মাঁচায় ।
আয় অশান্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।।

তোরে হেথায় করবে সবাই মানা ।
হঠাৎ আলো দেখবে যখন
ভাববে , একি বিষম কান্ডখানা !
সংঘাতে তোর উঠবে ওরা রেগে ,
শয়ন ছেড়ে আসবে ছুটে বেগে
সেই সুযোগে ঘুমের থেকে জেগে
লাগবে লড়াই মিথ্যা এবং সাঁচায় ।
আয় প্রচন্ড , আয়রে আমার কাঁচা ।।

শিকল-দেবীর ওই যে পূজাবেদি
চিরকাল কি রইবে খাড়া ?
পাগলামি , তুই আয়রে দুয়ার ভেদি ।
ঝড়ের মাতন বিজয়-কেতন নেড়ে
অট্টহাস্যে আকাশখানা ফেড়ে
ভোলানাথের ঝোলাঝুলি ঝেড়ে
ভুলগুলো সব আনরে বাছা বাছা ।
আয় প্রমত্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।।

আনরে টেনে বাঁধা পথের শেষে ।
বিবাগি কর অবাধ-পানে ,
পথ কেটে যাই অজানাদের দেশে ।
আপদ আছে , জানি আঘাত আছে ,
তাই জেনে তো বক্ষে পরাণ নাচে ----
ঘুচিয়ে দে ভাই , পুঁথিপোড়োর কাছে
পথে চলার বিধি বিধান যাচা ।
আয় প্রমুক্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।।

চিরযুবা তুই যে চিরজীবী ,
জীর্ণ জরা ঝরিয়ে দিয়ে
প্রাণ অফুরাণ ছড়িয়ে দেদার দিবি ।
সবুজ নেশায় ভোর করেছিস ধরা ,
ঝড়ের মেঘে তোরই তড়িৎ ভরা ,
বসন্তেরে পরাস আকুল-করা
আপন গলার বকুল মালা-গাছা ।
আয় রে অমর , আয় রে আমার কাঁচা ।।

Wednesday, 8 May 2019

ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের কবিতা --- দারোগাবাবু এবং হাবু

দারোগাবাবু এবং হাবু
ভবানীপ্রসাদ মজুমদার

থানায় গিয়ে সেদিন ভোরে

বললে কেঁদেই হাবু ,
নালিশ আমার মন দিয়ে খুব
শুনুন বড়োবাবু ।

চার চারজন ভাই আমরা

একটা ঘরেই থাকি ,
দুঃখে আমি সারা দিন-রাত
ভগবানকেই ডাকি ।

বড়দা ঘরেই সাতটা বেড়াল

পোষেন ছোটো-বড়ো ,
মেজদা পোষেন আটটা কুকুর
যতই বারণ করো ।

সেজদা পাগল , দশটা ছাগল

রাখেন ঘরেই বেঁধে ,
গন্ধে তাদের প্রাণ যায় যায়
মরছি কেঁদে কেঁদে ।

দারোগাবাবু বললে , হাবু

তোমরা কি সব ভুলো
সদাই খুলে রাখবে ঘরের
জানলা দরজাগুলো ।

শুনেই হাবু বেজায় কাবু

বললে করুণ সুরে ,
দেড়শো পোষা পায়রা আমার
যাবেই যে সব উড়ে ।

Tuesday, 23 April 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- খেলাভোলা

খেলাভোলা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তুই কি ভাবিস দিন রাত্তির
খেলতে আমার মন ?
কক্ষনো তা সত্যি না মা ,
আমার কথা শোন ।

সেদিন ভোরে দেখি উঠে
বৃষ্টি বাদল গেছে ছুটে ,
রোদ উঠেছে ঝিলমিলিয়ে
বাঁশের ডালে ডালে ।

ছুটির দিনে কেমন সুরে
পুজোর সানাই বাজছে দূরে ,
তিনটি শালিক ঝগড়া করে
রান্নাঘরের চালে ।

খেলনাগুলো সামনে মেলি
কিযে খেলি , কি যে খেলি ,
সেই কথাটাই সমস্তক্ষণ
ভাবনু আপন মনে ।

লাগল না ঠিক কোনো খেলাই
কেটে গেল সারা বেলাই ---
রেলিং ধরে রইনু বসে
বারান্দাটার কোনে ।।

খেলাভোলার দিন মা ,
আমার আসে মাঝে মাঝে ---
সেদিন আমার মনের ভিতর
কেমনতর বাজে ।

শীতের বেলায় দুই পহরে
দূরে কাদের ছাদের পরে
ছোট্ট মেয়ে রোদ্দুরে দেয়
বেগনি রঙের শাড়ি ।

চেয়ে চেয়ে চুপ করে রই ,
তেপান্তরের পার বুঝি ওই ---
মনে ভাবি ওইখানেতেই
আছে রাজার বাড়ি  ।

থাকত যদি মেঘে ওড়া
পক্ষীরাজের বাচ্ছা ঘোড়া ,
তক্ষুনি যে যেতেম তারে
লাগাম দিয়ে কষে ।

যেতে যেতে নদীর তীরে
ব্যঙ্গমা আর ব্যঙ্গমীরে।
পথ শুধিয়ে নিতেম আমি
গাছের তলায় বসে।।

এক এক দিন যে দেখেছি
তুই বাবার চিঠি হাতে
চুপ করে কী ভাবিস বসে
ঠেস দিয়ে জানালাতে।

মনে হয় তোর মুখ চেয়ে
তুই যেন কোন দেশের মেয়ে,
যেন আমার অনেক কালের
অনেক দূরের মা।

কাছে গিয়ে হাতখানি ছুই
হারিয়ে যাওয়া মা যেন তুই,
মাঠ পারে কোন বটের তলায়
বাঁশির সুরের মা।

খেলার কথা যায় যে ভেসে,
মনে ভাবি কোন কালে সে
কোন দেশে তোর বাড়ি ছিল
কোন সাগরের কুলে।

ফিরে যেতে ইচ্ছে করে
অজানা সেই দ্বীপের ঘরে
তোমায় আমায় ভোর ‌বেলাতে
নৌকোতে পাল তুলে।।

Saturday, 20 April 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- আগমন

আগমন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তখন রাত্রি আঁধার হল , সাঙ্গ হল কাজ ---

আমরা মনে ভেবেছিলেম , আসবে না কেউ আজ ।
মোদের গ্রামে দুয়ার যত     রূদ্ধ হল রাতের মতো ---
দুয়েকজনে বলেছিল , ' আসবে মহারাজ  ' ।
আমরা হেসে বলেছিলাম , ' আসবে না কেউ আজ ' ।

দ্বারে যেন আঘাত হল শুনেছিলেম সবে ---

আমরা তখন বলেছিলেম , ' বাতাস বুঝি হবে ' ।
নিবিয়ে প্রদীপ ঘরে ঘরে    শুয়েছিলেম আলসভরে ----
দুয়েকজনে বলেছিল , ' দূত এল বা তবে । '
আমরা হেসে বলেছিলেম , ' বাতাস বুঝি হবে ।'

নিশীথ রাতে শোনা গেল কিসের যেন ধ্বনি ---

ঘুমের ঘোরে ভেবেছিলেম মেঘের গরজনি ।
ক্ষণে ক্ষণে চেতন করি      কাঁপল ধরা থরহরি ---
দুয়েকজনে বলেছিল , ' চাকার ঝনঝনি ' ।
ঘুমের ঘরে কহি মোরা ' মেঘের গরজনি ' ।

তখনো রাত আঁধার আছে , বেজে উঠল ভেরী ---

কে ফুকারে ' জাগো সবাই , আর কোরো না দেরি । '
বক্ষ'পরে দুহাত চেপে     আমরা ভয়ে উঠি কেঁপে ,
দুয়েক জনে কহে কানে , ' রাজার ধ্বজা হেরি । '
আমরা জেগে উঠে বলি , ' আর তবে নয় দেরি । '

কোথায় আলো , কোথায় মালা , কোথায় আয়োজন !

রাজা আমার দেশে এল , কোথায় সিংহাসন !
হায় রে ভাগ্য , হায় রে লজ্জা --- কোথায় সভা কোথায় সজ্জা !
দুয়েক জনে কহে কানে , ' বৃথা এ ক্রন্দন , 
রিক্তকরে শূণ্য ঘরে করো অভ্যর্থন ।'
ওরে , দুয়ার খুলে দে রে , বাজা শঙ্খ বাজা ---
গভীর রাতে এসেছে আজ আঁধার ঘরের রাজা ।
বজ্র ডাকে শূণ্যতলে ,    বিদ্যুতেরই ঝিলিক ঝলে ,
ছিন্ন শয়ন টেনে এনে আঙিনা তোর সাজা ----
ঝড়ের সাথে হঠাৎ এল দুঃখ রাতের রাজা ।

Monday, 8 April 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- সুখদুঃখ

সুখদুঃখ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বসেছে আজ রথের তলায় 
স্নানযাত্রার মেলা ।
সকাল থেকে বাদল হল
ফুরিয়ে এল বেলা ।
আজকে দিনের মেলামেশা ,
যত খুশি , যতই নেশা ,
সবার চেয়ে আনন্দময়
ওই মেয়েটির হাসি ।
এক পয়সায় কিনেছে ও
তালপাতার এক বাঁশি ।
বাজে বাঁশি , পাতার বাঁশি
আনন্দস্বরে ।
হাজার লোকের হর্ষধ্বনি
সবার উপরে ।

ঠাকুরবাড়ি ঠেলাঠেলি
লোকের নাহি শেষ ।
অবিশ্রান্ত বৃষ্টিধারায়
ভেসে যায় রে দেশ ।
আজকে দিনের দুঃখ যত
নাই রে দুঃখ উহার মত
ওই যে ছেলে কাতর চোখে
দোকান-পানে চাহি ,
একটি রাঙা লাঠি কিনবে
একটি পয়সা নাহি ।
চেয়ে আছে নিমেষহারা,
নয়ন অরুণ ।
হাজার লোকের মেলাটিরে
করেছে করুণ ।

Thursday, 4 April 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- আফ্রিকা

আফ্রিকা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

উদভ্রান্ত সেই আদিম যুগে

স্রষ্টা যখন নিজের প্রতি অসন্তোষে
নতুন সৃষ্টিকে বারবার করছিলেন বিধ্বস্ত ,
তাঁর সেই অধৈর্যে ঘন-ঘন মাথা নাড়ার দিনে
রুদ্র সমুদ্রের বাহু
প্রাচী ধরিত্রীর বুকের থেকে
ছিনিয়ে নিয়ে গেল তোমাকে , আফ্রিকা ---
বাঁধলে তোমাকে বনস্পতির নিবিড় পাহারায়
কৃপণ আলোর অন্তঃপুরে ।
সেখানে নিভৃত অবকাশে তুমি
সংগ্রহ করছিলে দুর্গমের রহস্য ,
চিনছিলে জলস্থল- আকাশের দুর্বোধ সংকেত ,
প্রকৃতির দৃষ্টি-অতীত জাদু
মন্ত্র জাগাচ্ছিল , তোমার চেতনাতীত মনে ।
বিদ্রূপ করছিলে ভীষণকে
বিরূপের ছদ্মবেশে ,
শঙ্কাকে চাচ্ছিলে হার মানাতে
আপনাকে উগ্র ক'রে বিভীষিকার প্রচন্ড মহিমায়
তান্ডবের দুন্দুভি নিনাদে ।।

হায় ছায়াবৃতা ,

কালো ঘোমটার নীচে
অপরিচিত ছিল তোমার মানবরূপ
উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে ।
এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে ,
নখ যাদের তীক্ষ্ম তোমার নেকড়ের চেয়ে ,
এল মানুষ-ধরার দল
গর্বে যারা অন্ধ তোমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে ।
সভ্যের বর্বর লোভ
নগ্ন করল আপন নির্লজ্জ অমানুষতা ।
তোমার ভাষাহীন ক্রন্দনে বাষ্পাকুল অরণ্যপথে
পঙ্কিল হলো ধূলি তোমার রক্তে অশ্রুতে মিশে ,
দস্যু-পায়ের কাঁটা-মারা জুতোর তলায়
বীভৎস কাদার পিন্ড
চিরচিহ্ণ দিয়ে গেল তোমার অপমানিত ইতিহাসে ।।

সমুদ্রপারে সেই মুহূর্তেই তাদের পাড়ায় পাড়ায়

মন্দিরে বাজছিল পূজার ঘন্টা
সকালে সন্ধ্যায় দয়াময় দেবতার নামে ;
শিশুরা খেলছিল মায়ের কোলে ;
কবির সংগীতে বেজে উঠেছিল
সুন্দরের আনাগোনা ।।

আজ যখন পশ্চিম দিগন্তে

প্রদোষকাল ঝঞ্ঝাবাতাসে রূদ্ধশ্বাস ,
যখন গুপ্ত গহ্বর থেকে পশুরা বেরিয়ে এল ---
অশুভ ধ্বনিতে ঘোষণা করল দিনের অন্তিমকাল ,
এসো যুগান্তের কবি ,
আসন্ন সন্ধ্যার শেষ রশ্মিপাতে
দাঁড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে ;
বলো ' ক্ষমা করো ' ----
হিংস্র প্রলাপের মধ্যে
সেই হোক তোমার সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী ।।

Saturday, 30 March 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- দেবতার বিদায়

দেবতার বিদায়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দেবতামন্দিরমাঝে ভকত প্রবীণ
জপিতেছে জপমালা বসি নিশিদিন।
হেনকালে সন্ধ্যাবেলা ধুলিমাখা দেহে
বস্ত্রহীন জীর্ণ দীন পশিল সে গেহে।
কহিল কাতরকণ্ঠে "গৃহ মোর নাই
এক পাশে দয়া করে দেহো মোরে ঠাঁই।"
সসংকোচে ভক্তবর কহিলেন তারে,
"আরে আরে অপবিত্র, দূর হয়ে যারে।"
সে কহিল, "চলিলাম"--চক্ষের নিমেষে
ভিখারি ধরিল মূর্তি দেবতার বেশে।

ভক্ত কহে, "প্রভু, মোরে কী ছল ছলিলে!"
দেবতা কহিল, "মোরে দূর করি দিলে।
জগতে দরিদ্ররূপে ফিরি দয়াতরে,
গৃহহীনে গৃহ দিলে আমি থাকি ঘরে।"