Friday, 31 May 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা - সবুজের অভিযান

ওরে নবীন , ওরে আমার কাঁচা ,
ওরে সবুজ , ওরে অবুঝ ,
আধ-মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা ।
রক্ত আলোর মদে মাতাল ভোরে ,
আজকে যে যা বলে বলুক তোরে ,
সকল তর্ক হেলায় তুচ্ছ করে
পুচ্ছটি তোর উচ্চে তুলে নাচা ।
আয় দুরন্ত , আয়রে আমার কাঁচা ।।

খাঁচাখানা দুলছে মৃদু হাওয়ায় ;
আর তো কিছুই নড়ে না রে
ওদের ঘরে , ওদের ঘরের দাওয়ায় ।
ওই যে প্রবীন , ওই যে পরম পাকা -----
চক্ষুকর্ণ দুইটি ডানায় ঢাকা ,
ঝিমায় যেন চিত্রপটে আঁকা
অন্ধকারে বন্ধ করা খাঁচায় ।
আয় জীবন্ত , আয়রে আমার কাঁচা ।।

বাহির পানে তাকায় না যে কেউ ,
দেখে না যে বান ডেকেছে -----
জোয়ার-জলে উঠছে প্রবল ঢেউ ।
চলতে ওরা চায়না মাটির ছেলে
মাটির পরে চরণ ফেলে ফেলে ,
আছে অচল আসনখানা মেলে
যে যার আপন উচ্চ বাঁশের মাঁচায় ।
আয় অশান্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।।

তোরে হেথায় করবে সবাই মানা ।
হঠাৎ আলো দেখবে যখন
ভাববে , একি বিষম কান্ডখানা !
সংঘাতে তোর উঠবে ওরা রেগে ,
শয়ন ছেড়ে আসবে ছুটে বেগে
সেই সুযোগে ঘুমের থেকে জেগে
লাগবে লড়াই মিথ্যা এবং সাঁচায় ।
আয় প্রচন্ড , আয়রে আমার কাঁচা ।।

শিকল-দেবীর ওই যে পূজাবেদি
চিরকাল কি রইবে খাড়া ?
পাগলামি , তুই আয়রে দুয়ার ভেদি ।
ঝড়ের মাতন বিজয়-কেতন নেড়ে
অট্টহাস্যে আকাশখানা ফেড়ে
ভোলানাথের ঝোলাঝুলি ঝেড়ে
ভুলগুলো সব আনরে বাছা বাছা ।
আয় প্রমত্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।।

আনরে টেনে বাঁধা পথের শেষে ।
বিবাগি কর অবাধ-পানে ,
পথ কেটে যাই অজানাদের দেশে ।
আপদ আছে , জানি আঘাত আছে ,
তাই জেনে তো বক্ষে পরাণ নাচে ----
ঘুচিয়ে দে ভাই , পুঁথিপোড়োর কাছে
পথে চলার বিধি বিধান যাচা ।
আয় প্রমুক্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।।

চিরযুবা তুই যে চিরজীবী ,
জীর্ণ জরা ঝরিয়ে দিয়ে
প্রাণ অফুরাণ ছড়িয়ে দেদার দিবি ।
সবুজ নেশায় ভোর করেছিস ধরা ,
ঝড়ের মেঘে তোরই তড়িৎ ভরা ,
বসন্তেরে পরাস আকুল-করা
আপন গলার বকুল মালা-গাছা ।
আয় রে অমর , আয় রে আমার কাঁচা ।।

Wednesday, 8 May 2019

ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের কবিতা --- দারোগাবাবু এবং হাবু

দারোগাবাবু এবং হাবু
ভবানীপ্রসাদ মজুমদার

থানায় গিয়ে সেদিন ভোরে

বললে কেঁদেই হাবু ,
নালিশ আমার মন দিয়ে খুব
শুনুন বড়োবাবু ।

চার চারজন ভাই আমরা

একটা ঘরেই থাকি ,
দুঃখে আমি সারা দিন-রাত
ভগবানকেই ডাকি ।

বড়দা ঘরেই সাতটা বেড়াল

পোষেন ছোটো-বড়ো ,
মেজদা পোষেন আটটা কুকুর
যতই বারণ করো ।

সেজদা পাগল , দশটা ছাগল

রাখেন ঘরেই বেঁধে ,
গন্ধে তাদের প্রাণ যায় যায়
মরছি কেঁদে কেঁদে ।

দারোগাবাবু বললে , হাবু

তোমরা কি সব ভুলো
সদাই খুলে রাখবে ঘরের
জানলা দরজাগুলো ।

শুনেই হাবু বেজায় কাবু

বললে করুণ সুরে ,
দেড়শো পোষা পায়রা আমার
যাবেই যে সব উড়ে ।

Tuesday, 23 April 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- খেলাভোলা

খেলাভোলা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তুই কি ভাবিস দিন রাত্তির
খেলতে আমার মন ?
কক্ষনো তা সত্যি না মা ,
আমার কথা শোন ।

সেদিন ভোরে দেখি উঠে
বৃষ্টি বাদল গেছে ছুটে ,
রোদ উঠেছে ঝিলমিলিয়ে
বাঁশের ডালে ডালে ।

ছুটির দিনে কেমন সুরে
পুজোর সানাই বাজছে দূরে ,
তিনটি শালিক ঝগড়া করে
রান্নাঘরের চালে ।

খেলনাগুলো সামনে মেলি
কিযে খেলি , কি যে খেলি ,
সেই কথাটাই সমস্তক্ষণ
ভাবনু আপন মনে ।

লাগল না ঠিক কোনো খেলাই
কেটে গেল সারা বেলাই ---
রেলিং ধরে রইনু বসে
বারান্দাটার কোনে ।।

খেলাভোলার দিন মা ,
আমার আসে মাঝে মাঝে ---
সেদিন আমার মনের ভিতর
কেমনতর বাজে ।

শীতের বেলায় দুই পহরে
দূরে কাদের ছাদের পরে
ছোট্ট মেয়ে রোদ্দুরে দেয়
বেগনি রঙের শাড়ি ।

চেয়ে চেয়ে চুপ করে রই ,
তেপান্তরের পার বুঝি ওই ---
মনে ভাবি ওইখানেতেই
আছে রাজার বাড়ি  ।

থাকত যদি মেঘে ওড়া
পক্ষীরাজের বাচ্ছা ঘোড়া ,
তক্ষুনি যে যেতেম তারে
লাগাম দিয়ে কষে ।

যেতে যেতে নদীর তীরে
ব্যঙ্গমা আর ব্যঙ্গমীরে।
পথ শুধিয়ে নিতেম আমি
গাছের তলায় বসে।।

এক এক দিন যে দেখেছি
তুই বাবার চিঠি হাতে
চুপ করে কী ভাবিস বসে
ঠেস দিয়ে জানালাতে।

মনে হয় তোর মুখ চেয়ে
তুই যেন কোন দেশের মেয়ে,
যেন আমার অনেক কালের
অনেক দূরের মা।

কাছে গিয়ে হাতখানি ছুই
হারিয়ে যাওয়া মা যেন তুই,
মাঠ পারে কোন বটের তলায়
বাঁশির সুরের মা।

খেলার কথা যায় যে ভেসে,
মনে ভাবি কোন কালে সে
কোন দেশে তোর বাড়ি ছিল
কোন সাগরের কুলে।

ফিরে যেতে ইচ্ছে করে
অজানা সেই দ্বীপের ঘরে
তোমায় আমায় ভোর ‌বেলাতে
নৌকোতে পাল তুলে।।

Saturday, 20 April 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- আগমন

আগমন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তখন রাত্রি আঁধার হল , সাঙ্গ হল কাজ ---

আমরা মনে ভেবেছিলেম , আসবে না কেউ আজ ।
মোদের গ্রামে দুয়ার যত     রূদ্ধ হল রাতের মতো ---
দুয়েকজনে বলেছিল , ' আসবে মহারাজ  ' ।
আমরা হেসে বলেছিলাম , ' আসবে না কেউ আজ ' ।

দ্বারে যেন আঘাত হল শুনেছিলেম সবে ---

আমরা তখন বলেছিলেম , ' বাতাস বুঝি হবে ' ।
নিবিয়ে প্রদীপ ঘরে ঘরে    শুয়েছিলেম আলসভরে ----
দুয়েকজনে বলেছিল , ' দূত এল বা তবে । '
আমরা হেসে বলেছিলেম , ' বাতাস বুঝি হবে ।'

নিশীথ রাতে শোনা গেল কিসের যেন ধ্বনি ---

ঘুমের ঘোরে ভেবেছিলেম মেঘের গরজনি ।
ক্ষণে ক্ষণে চেতন করি      কাঁপল ধরা থরহরি ---
দুয়েকজনে বলেছিল , ' চাকার ঝনঝনি ' ।
ঘুমের ঘরে কহি মোরা ' মেঘের গরজনি ' ।

তখনো রাত আঁধার আছে , বেজে উঠল ভেরী ---

কে ফুকারে ' জাগো সবাই , আর কোরো না দেরি । '
বক্ষ'পরে দুহাত চেপে     আমরা ভয়ে উঠি কেঁপে ,
দুয়েক জনে কহে কানে , ' রাজার ধ্বজা হেরি । '
আমরা জেগে উঠে বলি , ' আর তবে নয় দেরি । '

কোথায় আলো , কোথায় মালা , কোথায় আয়োজন !

রাজা আমার দেশে এল , কোথায় সিংহাসন !
হায় রে ভাগ্য , হায় রে লজ্জা --- কোথায় সভা কোথায় সজ্জা !
দুয়েক জনে কহে কানে , ' বৃথা এ ক্রন্দন , 
রিক্তকরে শূণ্য ঘরে করো অভ্যর্থন ।'
ওরে , দুয়ার খুলে দে রে , বাজা শঙ্খ বাজা ---
গভীর রাতে এসেছে আজ আঁধার ঘরের রাজা ।
বজ্র ডাকে শূণ্যতলে ,    বিদ্যুতেরই ঝিলিক ঝলে ,
ছিন্ন শয়ন টেনে এনে আঙিনা তোর সাজা ----
ঝড়ের সাথে হঠাৎ এল দুঃখ রাতের রাজা ।

Monday, 8 April 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- সুখদুঃখ

সুখদুঃখ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বসেছে আজ রথের তলায় 
স্নানযাত্রার মেলা ।
সকাল থেকে বাদল হল
ফুরিয়ে এল বেলা ।
আজকে দিনের মেলামেশা ,
যত খুশি , যতই নেশা ,
সবার চেয়ে আনন্দময়
ওই মেয়েটির হাসি ।
এক পয়সায় কিনেছে ও
তালপাতার এক বাঁশি ।
বাজে বাঁশি , পাতার বাঁশি
আনন্দস্বরে ।
হাজার লোকের হর্ষধ্বনি
সবার উপরে ।

ঠাকুরবাড়ি ঠেলাঠেলি
লোকের নাহি শেষ ।
অবিশ্রান্ত বৃষ্টিধারায়
ভেসে যায় রে দেশ ।
আজকে দিনের দুঃখ যত
নাই রে দুঃখ উহার মত
ওই যে ছেলে কাতর চোখে
দোকান-পানে চাহি ,
একটি রাঙা লাঠি কিনবে
একটি পয়সা নাহি ।
চেয়ে আছে নিমেষহারা,
নয়ন অরুণ ।
হাজার লোকের মেলাটিরে
করেছে করুণ ।

Thursday, 4 April 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- আফ্রিকা

আফ্রিকা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

উদভ্রান্ত সেই আদিম যুগে

স্রষ্টা যখন নিজের প্রতি অসন্তোষে
নতুন সৃষ্টিকে বারবার করছিলেন বিধ্বস্ত ,
তাঁর সেই অধৈর্যে ঘন-ঘন মাথা নাড়ার দিনে
রুদ্র সমুদ্রের বাহু
প্রাচী ধরিত্রীর বুকের থেকে
ছিনিয়ে নিয়ে গেল তোমাকে , আফ্রিকা ---
বাঁধলে তোমাকে বনস্পতির নিবিড় পাহারায়
কৃপণ আলোর অন্তঃপুরে ।
সেখানে নিভৃত অবকাশে তুমি
সংগ্রহ করছিলে দুর্গমের রহস্য ,
চিনছিলে জলস্থল- আকাশের দুর্বোধ সংকেত ,
প্রকৃতির দৃষ্টি-অতীত জাদু
মন্ত্র জাগাচ্ছিল , তোমার চেতনাতীত মনে ।
বিদ্রূপ করছিলে ভীষণকে
বিরূপের ছদ্মবেশে ,
শঙ্কাকে চাচ্ছিলে হার মানাতে
আপনাকে উগ্র ক'রে বিভীষিকার প্রচন্ড মহিমায়
তান্ডবের দুন্দুভি নিনাদে ।।

হায় ছায়াবৃতা ,

কালো ঘোমটার নীচে
অপরিচিত ছিল তোমার মানবরূপ
উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে ।
এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে ,
নখ যাদের তীক্ষ্ম তোমার নেকড়ের চেয়ে ,
এল মানুষ-ধরার দল
গর্বে যারা অন্ধ তোমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে ।
সভ্যের বর্বর লোভ
নগ্ন করল আপন নির্লজ্জ অমানুষতা ।
তোমার ভাষাহীন ক্রন্দনে বাষ্পাকুল অরণ্যপথে
পঙ্কিল হলো ধূলি তোমার রক্তে অশ্রুতে মিশে ,
দস্যু-পায়ের কাঁটা-মারা জুতোর তলায়
বীভৎস কাদার পিন্ড
চিরচিহ্ণ দিয়ে গেল তোমার অপমানিত ইতিহাসে ।।

সমুদ্রপারে সেই মুহূর্তেই তাদের পাড়ায় পাড়ায়

মন্দিরে বাজছিল পূজার ঘন্টা
সকালে সন্ধ্যায় দয়াময় দেবতার নামে ;
শিশুরা খেলছিল মায়ের কোলে ;
কবির সংগীতে বেজে উঠেছিল
সুন্দরের আনাগোনা ।।

আজ যখন পশ্চিম দিগন্তে

প্রদোষকাল ঝঞ্ঝাবাতাসে রূদ্ধশ্বাস ,
যখন গুপ্ত গহ্বর থেকে পশুরা বেরিয়ে এল ---
অশুভ ধ্বনিতে ঘোষণা করল দিনের অন্তিমকাল ,
এসো যুগান্তের কবি ,
আসন্ন সন্ধ্যার শেষ রশ্মিপাতে
দাঁড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে ;
বলো ' ক্ষমা করো ' ----
হিংস্র প্রলাপের মধ্যে
সেই হোক তোমার সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী ।।

Saturday, 30 March 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- দেবতার বিদায়

দেবতার বিদায়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দেবতামন্দিরমাঝে ভকত প্রবীণ
জপিতেছে জপমালা বসি নিশিদিন।
হেনকালে সন্ধ্যাবেলা ধুলিমাখা দেহে
বস্ত্রহীন জীর্ণ দীন পশিল সে গেহে।
কহিল কাতরকণ্ঠে "গৃহ মোর নাই
এক পাশে দয়া করে দেহো মোরে ঠাঁই।"
সসংকোচে ভক্তবর কহিলেন তারে,
"আরে আরে অপবিত্র, দূর হয়ে যারে।"
সে কহিল, "চলিলাম"--চক্ষের নিমেষে
ভিখারি ধরিল মূর্তি দেবতার বেশে।

ভক্ত কহে, "প্রভু, মোরে কী ছল ছলিলে!"
দেবতা কহিল, "মোরে দূর করি দিলে।
জগতে দরিদ্ররূপে ফিরি দয়াতরে,
গৃহহীনে গৃহ দিলে আমি থাকি ঘরে।"



Thursday, 28 March 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা -- হারিয়ে-যাওয়া

হারিয়ে-যাওয়া
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ছোট্ট আমার মেয়ে
সঙ্গিনীদের ডাক শুনতে পেয়ে
সিঁড়ি দিয়ে নিচের তলায় যাচ্ছিল সে নেমে
অন্ধকারে ভয়ে ভয়ে , থেমে থেমে।
হাতে ছিল প্রদীপখানি,
আঁচল দিয়ে আড়াল করে চলছিল সাবধানী।


আমি ছিলাম ছাতে
তারায়-ভরা চৈত্রমাসের রাতে।
হঠাৎ মেয়ের কান্না শুনে উঠে
দেখতে গেলেম ছুটে।
সিঁড়ির মধ্যে যেতে যেতে
প্রদীপটা তার নিভে গেছে বাতাসেতে।
শুধাই তারে, “কী হয়েছে বামী ?”
সে কেঁদে কয় নিচে থেকে, “হারিয়ে গেছি আমি।”


তারায় ভরা চৈত্রমাসের রাতে
ফিরে গিয়ে ছাতে
মনে হল আকাশ-পানে চেয়ে
আমার বামীর মতোই যেন অমনি কে এক মেয়ে
নীলাম্বরের আঁচলখানি ঘিরে
দীপশিখাটি বাঁচিয়ে একা চলছে ধীরে ধীরে।
নিবত যদি আলো, যদি হঠাৎ যেত থামি
আকাশ ভরে উঠত কেঁদে, “হারিয়ে গেছি আমি।”

Monday, 25 March 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- হঠাৎ দেখা

হঠাৎ দেখা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা , 

ভাবিনি সম্ভব হবে কোনদিন ।।

আগে ওকে বারবার দেখেছি 

লাল রঙের শাড়িতে --
দালিম-ফুলের মত রাঙা;
আজ পরেছে কালো রেশমের কাপড়,
আঁচল তুলেছে মাথায় 
দোলন-চাঁপার মত চিকন-গৌর মুখখানি ঘিরে ।
মনে হল , কালো রঙের একটা গভীর দূরত্ব
ঘনিয়ে নিয়েছে নিজের চার দিকে,
যে দূরত্ব সর্ষেক্ষেতের শেষ সীমানায়
শালবনের নীলাঞ্জনে ।
থমকে গেল আমার সমস্ত মনটা 
চেনা লোককে দেখলেম অচেনার গাম্ভীর্যে ।।


হঠাৎ খবরের কাগজ ফেলে দিয়ে 

আমাকে করলে নমস্কার ।
সমাজবিধির পথ গেল খুলে ‌
আলাপ করলেম শুরু --
'কেমন আছো', 'কেমন চলছে সংসার ' 
ইত্যাদি ।
সে রইল জানালার বাইরের দিকে চেয়ে 
যেন কাছের-দিনের ছোঁয়াচ-পার-হওয়া চাহনিতে ।
দিলে অত্যন্ত ছোটো দুটো-একটা জবাব ,
কোনটা বা দিলেই না ।
বুঝিয়ে দিলে হাতের অস্থিরতায় --
কেন এ-সব কথা ,
এর চেয়ে অনেক ভাল চুপ ক'রে থাকা ।।


আমি ছিলেম অন্য বেঞ্চিতে ওর সাথিদের সঙ্গে ।

এক সময়ে আঙুল নেড়ে জানালে কাছে আসতে ।
মনে হল কম সাহস নয় --
বসলুম ওর এক বেঞ্চিতে ।
গাড়ির আওয়াজের আড়ালে 
বললে মৃদুস্বরে ,
'কিছু মনে কোরো না ,
সময় কোথা সময় নষ্ট করবার !
আমাকে নামতে হবে পরের স্টেশনেই ;
দূরে যাবে তুমি ,
দেখা হবে না আর কোনোদিনই ।
তাই, যে প্রশ্নটার জবাব এতকাল থেমে আছে ,
শুনব তোমার মুখে ।
সত্য করে বলবে তো ?'
আমি বললাম ,'বলব' ।
বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়েই শুধোল,
'আমাদের গেছে যে দিন 
একেবারেই কি গেছে --
কিছুই কি নেই বাকি?'

একটুকু রইলেম চুপ করে ;

তার পর বললেম ,
'রাতের সব তারাই আছে 
দিনের আলোর গভীরে' ।

খটকা লাগল, কী জানি বানিয়ে বললেম নাকি ।

ও বললে, 'থাক এখন যাও ও দিকে' 
সবাই নেমে গেল পরের স্টেশনে ।
আমি চললেম একা ।। 

Wednesday, 20 March 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- দুই পাখি

দুই পাখি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

খাঁচার পাখি ছিল     সোনার খাঁচাটিতে
             বনের পাখি ছিল বনে।
একদা কী করিয়া     মিলন হল দোঁহে,
        কী ছিল বিধাতার মনে।
বনের পাখি বলে,  খাঁচার পাখি ভাই,
       বনেতে যাই দোঁহে মিলে।
খাঁচার পাখি বলে-- বনের পাখি, আয়
        খাঁচায় থাকি নিরিবিলে।'
                 বনের পাখি বলে-- "না,
আমি     শিকলে ধরা নাহি দিব।'
        খাঁচার পাখি বলে-- "হায়,
আমি     কেমনে বনে বাহিরিব!'

বনের পাখি গাহে বাহিরে বসি বসি
                 বনের গান ছিল যত,
খাঁচার পাখি পড়ে শিখানো বুলি তার--
                 দোঁহার ভাষা দুইমতো।
বনের  পাখি বলে, খাঁচার পাখি ভাই ,
        বনের গান গাও দিখি।
খাঁচার পাখি বলে, বনের পাখি ভাই,
খাঁচার গান লহো শিখি।
          বনের পাখি বলে-- না,
আমি     শিখানো গান নাহি চাই।'
        খাঁচার পাখি বলে-- "হায়,
আমি     কেমনে বন-গান গাই।'

         বনের পাখি বলে, "আকাশ ঘননীল,
        কোথাও বাধা নাহি তার।'
খাঁচার পাখি বলে, "খাঁচাটি পরিপাটি
        কেমন ঢাকা চারি ধার।
বনের পাখি বলে, "আপনা ছাড়ি দাও
        মেঘের মাঝে একেবারে।'
খাঁচার পাখি বলে, নিরালা সুখকোণে
        বাঁধিয়া রাখো আপনারে!'
        বনের পাখি বলে-- "না,
সেথা     কোথায় উড়িবারে পাই!'
        খাঁচার পাখি বলে-- "হায়,
মেঘে     কোথায় বসিবার ঠাঁই!'

এমনি দুই পাখি দোঁহারে ভালোবাসে
        তবুও কাছে নাহি পায়।
খাঁচার ফাঁকে ফাঁকে পরশে মুখে মুখে,
        নীরবে চোখে চোখে চায়।
দুজনে কেহ কারে বুঝিতে নাহি পারে,
        বুঝাতে নারে আপনায়।
দুজনে একা একা ঝাপটি মরে পাখা,
        কাতরে কহে, "কাছে আয়!'
        বনের পাখি বলে--না,
কবে     খাঁচার রুধি দিবে দ্বার।
        খাঁচার পাখি বলে--হায়,
মোর     শকতি নাহি উড়িবার।