Friday, 22 November 2019

শঙ্খ

শঙ্খ

তোমার শঙ্খ ধূলায় পড়ে , কেমন করে সইব !
বাতাস আলো গেল মরে , একি রে দুর্দৈব !
লড়বি কে আয় ধ্বজা বেয়ে , গান আছে যার ওঠ না গেয়ে ,
চলবি যারা চলরে ধেয়ে ---- আয় না রে নিঃশঙ্ক ।
ধূলায় পড়ে রইল চেয়ে ওই যে অভয় শঙ্খ ।।

চলেছিলাম পূজার ঘরে সাজিয়ে ফুলের অর্ঘ্য 
খুঁজি সারা দিনের পরে কোথায় শান্তিস্বর্গ ।
এবার আমার হৃদয়ক্ষত ভেবেছিলেম হবে গত ,
ধুয়ে মলিন চিহ্ণ যত হব নিষ্কলঙ্ক ।
পথে দেখি ধূলায় নত তোমার মহাশঙ্খ ।।

আরতিদীপ এই কি জ্বালা , এই কি আমার সন্ধ্যা ?
গাঁথব রক্তজবার মালা ? হায় রজনীগন্ধা !
ভেবেছিলাম যোঝাযুঝি মিটিয়ে পাব বিরাম খুঁজি ,
চুকিয়ে দিয়ে ঋণের পুঁজি লব তোমার অঙ্ক ।
হেনকালে ডাকল বুঝি নীরব তব শঙ্খ ।।

যৌবনেরই পরশমণি করাও তবে স্পর্শ ।
দীপক তানে উঠুক ধ্বনি দীপ্ত প্রাণের হর্ষ ।
নিশার বক্ষ বিদার করে উদ্ বোধনে গগন ভরে
অন্ধ দিকে দিগন্তরে জাগাও না আতঙ্ক ।
দুই হাতে আজ তুলব ধরে তোমার জয়শঙ্খ ।।

জানি জানি তন্দ্রা মম রইবে না আর চক্ষে ।
জানি শ্রাবণ-ধারাসম বাণ বাজিছে বক্ষে ।
কেউ বা ছুটে আসবে পাশে , কাঁদবে বা কেউ দীর্ঘশ্বাসে ,
দুঃস্বপনে কাঁপবে ত্রাসে সুপ্তির পর্যঙ্ক ।
বাজবে যে আজ মহোল্লাসে তোমার মহাশঙ্খ ।।

তোমার কাছে আরাম চেয়ে পেলেম শুধু লজ্জা ।এবার সকল অঙ্গ ছেয়ে পড়াও রণসজ্জা ।
ব্যাঘাত আসুক নব নব --- আঘাত খেয়ে অচল রব ,
বক্ষে আমার দুঃখে তব বাজবে জয়ডঙ্ক ।
দেব সকল শক্তি , লব অভয় তব শঙ্খ ।।

Thursday, 19 September 2019

মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতা ------ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
মাইকেল মধুসূদন দত্ত

বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে।

করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে,
দীন যে, দীনের বন্ধু !– উজ্জল জগতে
হেমাদ্রির হেম-কান্তি অম্লান কিরণে।
কিন্তু ভাগ্য-বলে পেয়ে সে মহা পর্বতে,
যে জন আশ্রয় লয় সুবর্ণ চরণে,
সেই জানে কত গুণ ধরে কত মতে
গিরীশ। কি সেবা তার সে সুখ সদনে !

দানে বারি নদীরূপ বিমলা কিঙ্করী।

যোগায় অমৃত ফল পরম আদরে
দীর্ঘ-শিরঃ তরু-দল, দাসরূপ ধরি।
পরিমলে ফুল-কুল দশ দিশ ভরে,
দিবসে শীতল শ্বাসী ছায়া, বনেশ্বরী,
নিশায় সুশান্ত নিদ্রা, ক্লান্তি দূর করে।

Monday, 26 August 2019

শঙ্খ ঘোষের কবিতা ---- যমুনাবতী

           যমুনাবতী
            শঙ্খ ঘোষ
One more unfortunate
Weary of breath
Rashly importunate
Gone to her death. – Thomas Hood

নিভন্ত এই চুল্লীতে মা
একটু আগুন দে
আরেকটু কাল বেঁচেই থাকি
বাঁচার আনন্দে।
নোটন নোটন পায়রাগুলি
খাঁচাতে বন্দী
দু’এক মুঠো ভাত পেলে তা
ওড়াতে মন দি’।

হায় তোকে ভাত দিই কী করে যে ভাত দিই হায়
হায় তোকে ভাত দেব কী দিয়ে যে ভাত দেব হায়

নিভন্ত এই চুল্লী তবে
একটু আগুন দে –
হাড়ের শিরায় শিখার মাতন
মরার আনন্দে।
দু’পারে দুই রুই কাৎলার
মারণী ফন্দী
বাঁচার আশায় হাত-হাতিয়ার
মৃত্যুতে মন দি’।

বর্গী না টর্গী না, যমকে কে সামলায়!
ধার-চকচকে থাবা দেখছ না হামলায়?
যাস্ নে ও-হামলায়, যাস্ নে।।

কান্না কন্যার মায়ের ধমনীতে আকুল ঢেউ তোলে, জ্বলে না-
মায়ের কান্নায় মেয়ের রক্তের উষ্ণ হাহাকার মরে না-
চলল মেয়ে রণে চলল।
বাজে না ডম্বরু, অস্ত্র ঝন্ ঝন্ করে না, জানল না কেউ তা
চলল মেয়ে রণে চলল।
পেশীর দৃঢ় ব্যথা, মুঠোর দৃঢ় কথা, চোখের দৃঢ় জ্বালা সঙ্গে
চলল মেয়ে রণে চলল।

নেকড়ে-ওজর মৃত্যু এল
মৃত্যুরই গান গা-
মায়ের চোখে বাপের চোখে
দু-তিনটে গঙ্গা।
দূর্বাতে তার রক্ত লেগে
সহস্র সঙ্গী
জাগে ধক্ ধক্, যজ্ঞে ঢালে
সহস্র মণ ঘি।

যমুনাবতী সরস্বতী কাল যমুনার বিয়ে
যমুনা তার বাসর রচে বারুদ বুকে দিয়ে
বিষের টোপর নিয়ে।
যমুনাবতী সরস্বতী গেছে এ পথ দিয়ে
দিয়েছে পথ, গিয়ে।

নিভন্ত এই চুল্লীতে বোন আগুন ফলেছে।

Thursday, 8 August 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- প্রশ্ন

প্রশ্ন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত, পাঠায়েছ বারে বারে

                     দয়াহীন সংসারে,

তারা বলে গেল "ক্ষমা করো সবে', বলে গেল "ভালোবাসো--

                     অন্তর হতে বিদ্বেষ-বিষ নাশো'।

বরণীয় তারা, স্মরণীয় তারা, তবুও বাহির-দ্বারে

আজি দুর্দিনে ফিরানু তাদের ব্যর্থ নমস্কারে।

আমি-যে দেখেছি গোপন হিংসা কপট রাত্রিছায়ে

               হেনেছে নিঃসহায়ে,

আমি-যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে

               বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে

আমি-যে দেখিনু তরুণ বালক উন্মাদ হয়ে ছুটে

কী যন্ত্রণায় মরেছে পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে।

কণ্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে, বাঁশি সংগীতহারা,

                 অমাবস্যার কারা

লুপ্ত করেছে আমার ভুবন দুঃস্বপনের তলে,

                 তাই তো তোমায় শুধাই অশ্রুজলে--

যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,

তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো।

Friday, 2 August 2019

সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা --- ইলশে গুঁড়ি

ইলশে গুঁড়ি
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

ইলশে গুঁড়ি!          ইলশে গুঁড়ি

ইলিশ মাছের ডিম।
ইলশে গুঁড়ি          ইলশে গুঁড়ি
দিনের বেলায় হিম।
কেয়াফুলে ঘুণ লেগেছে,
পড়তে পরাগ মিলিয়ে গেছে,
মেঘের সীমায় রোদ হেসেছে
আলতা-পাটি শিম্।
ইলশে গুঁড়ি          হিমের কুঁড়ি,
রোদ্দুরে রিম্ ঝিম্।
হালকা হাওয়ায়          মেঘের ছাওয়ায়
ইলশে গুঁড়ির নাচ, –
ইলশে গুঁড়ির          নাচন্ দেখে
নাচছে ইলিশ মাছ।
কেউ বা নাচে জলের তলায়
ল্যাজ তুলে কেউ ডিগবাজি খায়,
নদীতে ভাই জাল নিয়ে আয়,
পুকুরে ছিপ গাছ।
উলসে ওঠে মনটা, দেখে
ইলশে গুঁড়ির নাচ।

ইলশে গুঁড়ি          পরীর ঘুড়ি

কোথায় চলেছে,
ঝমরো চুলে          ইলশে গুঁড়ি
মুক্তো ফলেছে!
ধানের বনে চিংড়িগুলো
লাফিয়ে ওঠে বাড়িয়ে নুলো;
ব্যাঙ ডাকে ওই গলা ফুলো,
আকাশ গলেছে,
বাঁশের পাতায়          ঝিমোয় ঝিঁঝিঁ,
বাদল চলেছে।

মেঘায় মেঘায়          সূর্য্যি ডোবে

জড়িয়ে মেঘের জাল,
ঢাকলো মেঘের          খুঞ্চে-পোষে
তাল-পাটালীর থাল।
লিখছে যারা তালপাতাতে
খাগের কলম বাগিয়ে হাতে
তাল বড়া দাও তাদের পাতে
টাটকা ভাজা চাল;
পাতার বাঁশী          তৈরী করে’
দিও তাদের কাল।

খেজুর পাতায়          সবুজ টিয়ে

গড়তে পারে কে?
তালের পাতার          কানাই ভেঁপু
না হয় তাদের দে।
ইলশে গুঁড়ি – জলের ফাঁকি
ঝরছে কত বলব তা কী?
ভিজতে এল বাবুই পাখী
বাইরে ঘর থেকে; –
পড়তে পাখায়          লুকালো জল
ভিজলো নাকো সে।

ইলশে গুঁড়ি!          ইলশে গুঁড়ি!

পরীর কানের দুল,
ইলশে গুঁড়ি!          ইলশে গুঁড়ি!
ঝরো কদম ফুল।
ইলশে গুঁড়ির খুনসুড়িতে
ঝাড়ছে পাখা – টুনটুনিতে
নেবুফুলের          কুঞ্জটিতে
দুলছে দোদুল দুল্;
ইলশে গুঁড়ি           মেঘের খেয়াল
ঘুম-বাগানের ফুল।

Tuesday, 2 July 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ---- কৃষ্ণকলি

কৃষ্ণকলি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি ,

কালো তারে বলে গায়ের লোক ।
মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে
কালো মেয়ের কালো হরিণ- চোখ ।
ঘোমটা মাথায় ছিল না তার মোটে ,
মুক্তবেণী পীঠের পরে লোটে ।
কালো ? তা সে যতই কালো হোক ,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ ।।

ঘন মেঘে আঁধার হল দেখে

ডাকতেছিল শ্যামল দুটি গাই ,
শ্যামা মেয়ে ব্যস্ত ব্যাকুল পদে
কুটির হতে ত্রস্ত এল তাই ।
আকাশ-পানে হানি যুগল ভুরু
শুনলে বারেক মেঘের গুরুগুরু ।
কালো ? তা সে যতই কালো হোক ,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ ।।

পুবে বাতাস এল হঠাৎ ধেয়ে ,

ধানের ক্ষেতে খেলিয়ে গেল ঢেউ ।
আলের ধারে দাঁড়িয়েছিলেম একা ,
মাঠের মাঝে আর ছিল না কেউ ।
আমার পানে দেখলে কিনা চেয়ে ,
আমিই জানি আর জানে সেই মেয়ে ।
কালো ? তা সে যতই কালো হোক ,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ ।।

এমনি ক'রে কালো কাজল মেঘ

জ্যৈষ্ঠ মাসে আসে ঈশান কোনে ।
এমনি ক'রে কালো কোমল ছায়া
আষাঢ় মাসে নামে তমাল-বনে ।
এমনি ক'রে শ্রাবণ-রজনীতে
হঠাৎ খুশি ঘনিয়ে আসে চিতে ।
কালো ? তা সে যতই কালো হোক ,
দেখেছি তার কালোহরিণ-চোখ ।।

কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি ,

আর যা বলে বলুক অন্য লোক ।
দেখেছিলেম ময়নাপাড়ার মাঠে
কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ ।।
মাথার 'পরে দেয়নি তুলে বাস ,
লজ্জা পাবার পায়নি অবকাশ ।
কালো ? তা সে যতই কালো হোক ,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ ।।

Friday, 14 June 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ----- আমি চঞ্চল হে

আমি চঞ্চল হে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমি চঞ্চল হে ,
আমি সুদূরের পিয়াসি ।
দিন চলে যায় , আমি আনমনে
তারি আশা চেয়ে থাকি বাতায়নে -------
ওগো , প্রাণে মনে আমি যে তাহার পরশ পাবার প্রয়াসি !
আমি সুদূরের পিয়াসি ।
সুদূর , বিপুল সুদূর , তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি -----
মোর ডানা নাই , আছি এক ঠাই , সে কথা যে যাই পাসরি ।।

আমি উন্মনা হে , 
হে সুদূর , আমি উদাসী ।
রৌদ্রমাখানো অলস বেলায়
তরুমর্মরে , ছায়ার খেলায় ,
কী মুরতি তব নীলাকাশশায়ী নয়নে উঠে গো আভাসি ।
হে সুদূর , আমি উদাসী ।
সুদূর , বিপুল সুদূর , তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি -----
কক্ষে আমার রুদ্ধ দুয়ার , সে কথা যে যাই পাসরি ।।

Tuesday, 11 June 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ----- আমি

আমি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ ,
চুনি উঠল রাঙা হয়ে ।
আমি চোখ মেললুম আকাশে -----
জ্বলে উঠল আলো
পুবে পশ্চিমে ।
গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম ' সুন্দর ' ,
সুন্দর হল সে ।

তুমি বলবে এ যে তত্ত্বকথা , এ কবির বাণী নয় ।
আমি বলব , এ সত্য ,
তাই এ কাব্য ।
এ আমার অহংকার ------
অহংকার সমস্ত মানুষের হয়ে ।
মানুষের অহংকার-পটেই
বিশ্বকর্মার বিশ্বশিল্প ।
তত্ত্বজ্ঞানী জপ করছেন নিশ্বাসে প্রশ্বাসে -----
না , না , না ----
না পান্না , না চুনি , না আলো , না গোলাপ ,
না আমি , না তুমি ।
ও দিকে , অসীম যিনি তিনি স্বয়ং করছেন সাধনা
মানুষের সীমানায় , 
তাকেই বলে ' আমি ' ।
সেই আমির গহনে আলো-আঁধারের ঘটল সংগম ,
দেখা দিল রূপ , জেগে উঠল রস ।
' না ' কখন ফুটে উঠে হল ' হাঁ ' , মায়ার মন্ত্রে ,
রেখায় রঙে , সুখে দুঃখে ।।

একে বোলো না তত্ত্ব ;
আমার মন হয়েছে পুলকিত
বিশ্ব- আমির রচনার আসরে
হাতে নিয়ে তুলি , পাত্রে নিয়ে রঙ ।।

পন্ডিত বলছেন ------
বুড়ো চন্দ্রটা , নিষ্ঠুর চতুর হাসি তার ,
মৃত্যুদূতের মত গুঁড়ি মেরে আসছে সে
পৃথিবীর পাঁজরের কাছে ।
একদিন দেবে চরম টান তার সাগরে পর্বতে ;
মর্তলোকে মহাকালের নূতন খাতায়
পাতা জুড়ে নামবে একটা শূন্য ,
গিলে ফেলবে দিনরাতের জমাখরচ ;
মানুষের কীর্তি হারাবে কমরতার ভান ,
তার ইতিহাসে লেপে দেবে
অনন্ত রাত্রির কালি ।
মানুষের যাবার দিনের চোখ
বিশ্ব থেকে নিকিয়ে নেবে রঙ ,
মানুষের যাবার দিনের মন
ছানিয়ে নেবে রস ।
শক্তির কম্পন চলবে আকাশে আকাশে ,
জ্বলবে না কোথাও আলো ।
বীণাহীন সভায় যন্ত্রীর আঙুল নাচবে ,
বাজবে না সুর ।
সেদিন কবিত্বহীন বিধাতা একা রবেন বসে
নীলিমাহীন আকাশে
ব্যক্তিত্বহারা অস্তিত্বের গনিততত্ত্ব নিয়ে ।
তখন বিরাট বিশ্বভুবনে
দূরে দূরান্তে অনন্ত অসংখ্যলোকে লোকান্তরে
এ বাণী ধ্বনিত হবে না কোনোখানেই -------
' তুমি সুন্দর '
' আমি ভালোবাসি ' ।
বিধাতা কি আবার বসবেন সাধনা করতে
যুগযুগান্তর ধরে ?
প্রলয়সন্ধ্যায় জপ করবেন ------
' কথা কও , কথা কও ' ,
বলবেন ' বলো , তুমি সুন্দর ' ,
বলবেন ' বলো , আমি ভালোবাসি ' ?

Tuesday, 4 June 2019

কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা --- মানুষ

মানুষ
কাজী নজরুল ইসলাম

গাহি সাম্যের গান—
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।–-

‘পূজারী, দুয়ার খোল,
ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পূজার সময় হলো!’
স্বপন দেখিয়ে আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়,
দেবতার বরে রাজা-টাজা আজ হয়ে যাবো নিশ্চয়!—
জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুধায় কন্ঠ ক্ষীণ
ডাকিল পান্থ, ‘দ্বার খোল বাবা, খাইনি ক’ সাত দিন।
সহসা বন্ধ হ’ল মন্দির, ভুখারি ফিরিয়া চলে,
তিমির রাত্রি, পথ জুরে তার ক্ষুধার মানিক জ্বলে!
ভুখারি ফুকারি কয়,
ঐ মন্দির পূজারীর, হায় দেবতা, তোমার নয়!

মসজিদে কাল শিরনি আছিল, অঢেল গোস্ত-রুটি
বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটিকুটি!
এমন সময় এল মুসাফির গায়ে আজারির চিন,
বলে, ‘বাবা, আমি ভুখা-ফাখা আছি আজ নিয়ে সাত দিন!’
তেরিয়াঁ হইয়া হাকিল মোল্লা---“ভ্যালা হ’ল দেখি লেঠা,
ভুখা আছ মর গো-ভাগারে গিয়ে! নামাজ পড়িস বেটা?”
ভুখারি কহিল, “না বাবা!” মোল্লা হাঁকিল,---“তা’ হলে শালা,
সোজা পথ দেখ!” গোস্ত-রুটি নিয়া মসজিদে দিল তালা!

ভখারি ফিরিয়া চলে,
চলিতে চলিতে বলে---
“আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু,
আমার ক্ষুধার অন্ন তা’বলে বন্ধ করোনি প্রভু,
তব মসজিদ-মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবি,
মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি!”
কোথা চেংগিস, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়?
ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া-দ্বার!
খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা?
সব দ্বার এর খোলা র’বে, চালা হাতুরি-শাবল চালা!

হায় রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড গাহে স্বার্থের জয়!
মানুষেরে ঘৃণা করি’
ও’ কা’রা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি’
ও’ মুখ হইতে কেতাব-গ্রন্থ নাও জোর ক’রে কেড়ে,
যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে।
পূজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো,
মানুষ এনেছে গ্রন্থ;---গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো!
আদম দাউদ ঈসা মূসা ইব্রাহিব মোহাম্মদ
কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর,---বিশ্বের সম্পদ,
আমাদেরি এঁরা পিতা পিতামহ, এই আমাদের মাঝে
তাঁদেরি রক্ত কম-বেশি ক’রে প্রতি ধমনীতে-রাজে।
আমরা তাঁদেরি সন্তান, জ্ঞাতি, তাঁদেরি মতন দেহ,
কে জানে কখন মোরাও অমনি হয়ে যেতে পারি কেহ।

হেসো না বন্ধু! আমার আমি সে কত অতল অসীম,
আমিই কি জানি কে জানে আছে আমাতে মহামহিম।
হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদি ঈসা,
কে জানে কাহার অন্ত ও আদি, কে পায় কাহার দিশা?
কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি?
হয়ত উহারই বুকে ভগবান জাগিছেন দিবারাতি!
অথবা হয়ত কিছুই নহে সে, মহান উচ্চ নহে,
আছে ক্লেদাক্ত ক্ষত-বিক্ষত পড়িয়া দুঃখ-দহে,
তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন্থ ভজনালয় 
ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয়!
হয়ত ইহারই ঔরসে ভাই ইহারই কুটির-বাসে
জন্মিছে কেহ--- জোড়া নাই যার জগতের ইতিহাসে!
যে বাণী আজিও শোনেনি জগৎ, যে মহাশক্তিধরে
আজিও বিশ্ব দেখেনি,---হয়ত আসিছে সে এরই ঘরে!

ও কে? চণ্ডাল? চমকাও কেন? নহে ও ঘৃণ্য জীব!
ওই হতে পারে হরিশ্চন্দ্র, ওই শ্মশানের শিব।
আজ চণ্ডাল কা’ল হ’তে পারে মহাযোগী-সম্রাট,
তুমি কাল তারে অর্ঘ্য দানিবে, করিবে নান্দী-পাঠ।
রাখাল বলিয়া কারে কর হেলা,ও-হেলা কাহারে বাজে!
হয়ত গোপনে ব্রজের গোপাল এসেছে রাখাল-সাজে!
চাষা ব’লে কর ঘৃণা!
দে’খো চাষা-রুপে লুকায়ে জনক বলরাম এলো কি না!
যত নবী ছিল মেষের রাখাল, তারাও ধরিল হাল,
তারাই আনিল অমর বাণী---যা আছে র’বে চিরকাল।
দ্বারে গালি খেয়ে ফিরে যায় নিতি ভিখারি-ভিখারিনী,
তারি মাঝে কবে এলো ভোলা-নাথ গিরিজায়া, তা কি চিনি!
তোমার ভোগের হ্রাস হয় পাছে ভিক্ষা মুষ্ঠি-দিলে,
দ্বারী দিয়ে তাই মার দিয়ে তুমি দেবতারে খেদাইলে।

সে মার রহিল জমা---
কে জানে তোমায় লাঞ্ছিতা দেবী করিয়াছে কি না ক্ষমা!
বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ দু’চোখে স্বার্থ-ঠুলি,
নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হয়েছে কুলি।
মানুষের বুকে যেটুকু দেবতা, বেদনা-মথিত-সুধা,
তাই লুটে তুমি খাবে পশু? তুমি তা দিয়ে মিটাবে ক্ষুধা?
তোমার ক্ষুধার আহার তোমার মন্দোদরীই জানে
তোমার মৃত্যু-বাণ আছে তব প্রাসাদের কোনখানে!
তোমারে কামনা-রানী
যুগে যুগে, পশু, ফেলেছে তোমায় মৃত্যু-বিবরে টানি’।

Friday, 31 May 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা - সবুজের অভিযান

ওরে নবীন , ওরে আমার কাঁচা ,
ওরে সবুজ , ওরে অবুঝ ,
আধ-মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা ।
রক্ত আলোর মদে মাতাল ভোরে ,
আজকে যে যা বলে বলুক তোরে ,
সকল তর্ক হেলায় তুচ্ছ করে
পুচ্ছটি তোর উচ্চে তুলে নাচা ।
আয় দুরন্ত , আয়রে আমার কাঁচা ।।

খাঁচাখানা দুলছে মৃদু হাওয়ায় ;
আর তো কিছুই নড়ে না রে
ওদের ঘরে , ওদের ঘরের দাওয়ায় ।
ওই যে প্রবীন , ওই যে পরম পাকা -----
চক্ষুকর্ণ দুইটি ডানায় ঢাকা ,
ঝিমায় যেন চিত্রপটে আঁকা
অন্ধকারে বন্ধ করা খাঁচায় ।
আয় জীবন্ত , আয়রে আমার কাঁচা ।।

বাহির পানে তাকায় না যে কেউ ,
দেখে না যে বান ডেকেছে -----
জোয়ার-জলে উঠছে প্রবল ঢেউ ।
চলতে ওরা চায়না মাটির ছেলে
মাটির পরে চরণ ফেলে ফেলে ,
আছে অচল আসনখানা মেলে
যে যার আপন উচ্চ বাঁশের মাঁচায় ।
আয় অশান্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।।

তোরে হেথায় করবে সবাই মানা ।
হঠাৎ আলো দেখবে যখন
ভাববে , একি বিষম কান্ডখানা !
সংঘাতে তোর উঠবে ওরা রেগে ,
শয়ন ছেড়ে আসবে ছুটে বেগে
সেই সুযোগে ঘুমের থেকে জেগে
লাগবে লড়াই মিথ্যা এবং সাঁচায় ।
আয় প্রচন্ড , আয়রে আমার কাঁচা ।।

শিকল-দেবীর ওই যে পূজাবেদি
চিরকাল কি রইবে খাড়া ?
পাগলামি , তুই আয়রে দুয়ার ভেদি ।
ঝড়ের মাতন বিজয়-কেতন নেড়ে
অট্টহাস্যে আকাশখানা ফেড়ে
ভোলানাথের ঝোলাঝুলি ঝেড়ে
ভুলগুলো সব আনরে বাছা বাছা ।
আয় প্রমত্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।।

আনরে টেনে বাঁধা পথের শেষে ।
বিবাগি কর অবাধ-পানে ,
পথ কেটে যাই অজানাদের দেশে ।
আপদ আছে , জানি আঘাত আছে ,
তাই জেনে তো বক্ষে পরাণ নাচে ----
ঘুচিয়ে দে ভাই , পুঁথিপোড়োর কাছে
পথে চলার বিধি বিধান যাচা ।
আয় প্রমুক্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।।

চিরযুবা তুই যে চিরজীবী ,
জীর্ণ জরা ঝরিয়ে দিয়ে
প্রাণ অফুরাণ ছড়িয়ে দেদার দিবি ।
সবুজ নেশায় ভোর করেছিস ধরা ,
ঝড়ের মেঘে তোরই তড়িৎ ভরা ,
বসন্তেরে পরাস আকুল-করা
আপন গলার বকুল মালা-গাছা ।
আয় রে অমর , আয় রে আমার কাঁচা ।।