Wednesday, 19 February 2020

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর

বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দিনের আলো নিবে এল ,
সুয্যি ডোবে ডোবে ।
আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে
চাঁদের লোভে লোভে ।
মেঘের উপর মেঘ করেছে ,
রঙের উপর রং ।
মন্দিরেতে কাসঁর ঘন্টা
বাজল ঠঙ্ ঠঙ্ ।
ও পারেতে বৃষ্টি এল ,
ঝাপসা গাছপালা ।
এ পারেতে মেঘের মাথায়
একশো মানিক জ্বালা !
বাদলা হাওয়ায় মনে পড়ে
ছেলেবেলার গান ---
" বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর ,
নদেয় এল বান ! "

আকাশ জুড়ে মেঘের খেলা
কোথায় বা সীমানা ।
দেশে দেশে খেলে বেড়ায় ,
কেউ করে না মানা ।
কত নতুন ফুলের বনে
বিষ্টি দিয়ে যায় ।
পলে পলে নতুন খেলা
কোথায় ভেবে পায় ।
মেঘের খেলা দেখে কত
খেলা পড়ে মনে ----
কত দিনের লুকোচুরি
কত ঘরের কোনে ।
তারি সঙ্গে মনে পড়ে
ছেলেবেলার গান ----
" বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর ,
নদেয় এল বান ।"

মনে পড়ে , ঘরটি আলো
মায়ের হাসিমুখ ,
মনে পড়ে , মেঘের ডাকে
গুরু গুরু বুক ।
বিছানাটির একটি পাশে
ঘুমিয়ে আছে খোকা ,
মায়ের 'পরে দৌরাত্মি সে
না যায় লেখাজোকা ।
ঘরেতে দুরন্ত ছেলে
করে দাপাদাপি ।
বাইরেতে মেঘ ডেকে ওঠে ,
সৃষ্টি ওঠে কাঁপি ।
মনে পড়ে মায়ের মুখে
শুনেছিলাম গান ---
" বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর ,
নদেয় এল বান ।"

মনে পড়ে সুয়োরানি
দুয়োরানির কথা ,
মনে পড়ে অভিমানী
কঙ্কাবতীর ব্যথা ।
মনে পড়ে ঘরের কোনে
মিটি মিটি আলো ,
চারিদিকে দেয়ালেতে
ছায়া কালো কালো ।
বাইরে কেবল জলের শব্দ
ঝুপ্ ঝুপ্ ঝুপ্ ----
দস্যি ছেলে গল্প শোনে
একেবারে চুপ ।
তারি সঙ্গে মনে পড়ে
মেঘলা দিনের গান ----
" বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর ,
নদেয় এল বান ।"

কবে বিষ্টি পড়েছিল ,
বান এল সে কোথা ।
শিবঠাকুরের বিয়ে হল
কবেকার সে কথা ।
সেদিনও সে এমনিতরো
মেঘের ঘটাখানা ।
থেকে থেকে বিজুলি কি
দিতেছিল হানা ।
তিন কন্যে বিয়ে ক'রে
কী হল তার শেষে ।
না জানি কোন নদীর ধারে ,
না জানি কোন দেশে ,
কোন ছেলেরে ঘুম পাড়াতে
কে গাহিল গান ----
" বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর ,
নদেয় এল বান !"

Saturday, 21 December 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- আত্মসমর্পণ

আত্মসমর্পণ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তোমার আনন্দগানে আমি দিব সুর
যাহা জানি দু-একটি প্রীতিসুমধুর
অন্তরের ছন্দোগাথা ; দুঃখের ক্রন্দনে
বাজিবে আমার কন্ঠ বিষাদবিধুর
তোমার কন্ঠের সনে ; কুসুমে চন্দনে
তোমারে পূজিব আমি ; পরাব সিন্দূর
তোমার সীমান্তে ভালে ; বিচিত্র বন্ধনে
তোমারে বাঁধিব আমি , প্রমোদ সিন্ধুর
তরঙ্গেতে দিব দোলা নব ছন্দে তানে ।
মানব - আত্মার গর্ব আর নাহি মোর ,
চেয়ে তোর স্নিগ্ধশ্যাম মাতৃমুখ-পানে
ভালোবাসিয়াছি আমি ধূলিমাটি তোর ।
জন্মেছি যে মর্ত-কোলে ঘৃণা করি তারে
ছুটিব না স্বর্গ আর মুক্তি খুঁজিবারে ।

Thursday, 19 December 2019

সুকুমার রায়ের কবিতা --- বোম্বাগড়ের রাজা

বোম্বাগড়ের রাজা
সুকুমার রায়


কেউ কি জানো সদাই কেন বোম্বাগড়ের রাজা ---
ছবির ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখে আমসত্ব ভাজা ?
রানীর মাথায় অষ্টপ্রহর কেন বালিশ বাঁধা ?
পাঁউরুটিতে পেরেক ঠোকে কেন রানীর দাদা ?
কেন সেথায় সর্দি হলে ডিগবাজি খায় লোকে ?
জোছনা রাতে সবাই কেন আলতা মাখায় চোখে ?
ওস্তাদেরা লেপ মুড়ি দেয় কেন মাথায় ঘাড়ে ?
টাকের পরে পডিতেরা ডাকের টিকিট মারে !
রাত্রে কেন ট্যাঁকঘড়িটা ডুবিয়ে রাখে ঘিয়ে ?
কেন রাজার বিছনা পাতে শিরীষ কাগজ দিয়ে ?
সভায় কেন চেঁচায় রাজা ' হুক্কা হুয়া ' বলে ?
মন্ত্রী কেন কলসি বাজায় বসে রাজার কোলে ?
সিংহাসনে ঝোলায় কেন ভাঙা বোতল শিশি ?
কুমড়ো নিয়ে ক্রিকেট খেলে কেন রাজার পিসি ?
রাজার খুড়ো নাচেন কেন হুঁকোর মালা পরে ?
এমন কেন ঘটছে তা কেউ বলতে পারো মোরে ?

Tuesday, 17 December 2019

সুকুমার রায়ের কবিতা --- ঠিকানা

ঠিকানা
সুকুমার রায়

আরে আরে জগমোহন --- এসো , এসো , এসো ---
বলতে পারো কোথায় থাকে আদ্যানাথের মেশো ?
আদ্যানাথের নাম শোনোনি ? খগেনকে তো চেনো?
শ্যাম বাগচি খগেনেরই মামাশ্বশুর জেনো ।
শ্যামের জামাই কেষ্টমোহন , তার যে বাড়িওয়ালা --
( কি যেন নাম ভুলে গেছি ) তারই মামার শালা ;
তারই পিশের খুরতুতো ভাই আদ্যানাথের মেশো --
লক্ষ্মীদাদা , ঠিকানা তার একটু জেনে এসো ।
ঠিকানা চাও ? বলছি শোন ; আমড়াতলার মোড়ে
তিন-মুখো তিন রাস্তা গেছে তারি একটা ধরে ,
চলবে সিধে নাকবরাবর , ডানদিকে চোখ রেখে ;
চলতে চলতে দেখবে শেষে রাস্তা গিয়েছে বেঁকে ।
দেখবে সেথায় ডাইনে বাঁয়ে পথ গিয়েছে কত ,
তারি ভিতর ঘুরবে খানিক গোলোকধাঁধার মত ।
তার পরেতে হঠাৎ বেঁকে ডাইনে মোচর মেরে ,
ফিরবে আবার বাঁয়ের দিকে তিনটে গলি ছেড়ে ।তবেই আবার পড়বে এসে আমড়াতলার মোড়ে ---
তারপরে যাও যেথায় খুশি -- জ্বালিয়োনাকো মোরে।

Monday, 16 December 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- নিরুদ্দেশ যাত্রা

নিরুদ্দেশ যাত্রা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আর কত দূরে নিয়ে যাবে মোরে
হে সুন্দরী ?
বলো , কোন পার ভিড়িবে তোমার
সোনার তরী ।
যখনি শুধাই , ওগো বিদেশিনী ,
তুমি হাসো শুধু , মধুরহাসিনী ---
বুঝিতে না পারি , কী জানি কী আছে
তোমার মনে ।
নীরবে দেখাও অঙ্গুলি তুলি
অকূল সিন্ধু উঠিছে আকুলি ,
দূরে পচিমে ডুবিছে তপন
গগনকোনে ।
কী আছে হোথায় --- চলেছি কিসের 
অন্বেষণে ?

বলো দেখি মোরে , শুধাই তোমায়
অপরিচিতা ---
ওই যেথা জ্বলে সন্ধ্যার কূলে
দিনের চিতা ,
ঝলিতেছে জল তরল অনল ,
গলিয়া পড়িছে অম্বরতল ,
দিকবধূ যেন ছলছল আঁখি
অশ্রুজলে ,
হোথায় কি আছে আলয় তোমার
ঊর্মিমুখর সাগরের পার
মেঘচুম্বিত অস্তগিরির
চরণতলে ?
তুমি হাসো শুধু মুখপানে চেয়ে
কথা না বলে ।

হূহূ করে বায়ু ফেলিছে সতত
দীর্ঘশ্বাস ।
অন্ধ আবেগে করে গর্জন 
জলোচ্ছ্বাস ।
সংশয়ময় ঘননীল নীর ,
কোনোদিকে চেয়ে নাহি হেরি তীর ,
অসীম রোদন জগৎ প্লাবিয়া
দুলিছে যেন ।
তারি পরে ভাসে তরনী হিরণ ,
তারি পরে পড়ে সন্ধ্যাকিরণ ,
তারি মাঝে বসি এ নীরব হাসি
হাসিছ কেন ?
আমি তো বুঝিনা কী লাগি তোমার
বিলাস হেন ।

যখন প্রথম ডেকেছিলে তুমি
' কে যাবে সাথে '
চাহিনু বারেক তোমার নয়নে
নবীন প্রাতে ।
দেখালে সমুখে প্রসারিয়া কর
পশ্চিমপানে অসীম সাগর ,
চঞ্চল আলো আশার মতন
কাঁপিছে জলে ।
তরীতে উঠিয়া শুধানু তখন
আছে কি হোথায় নবীন জীবন ,
আশার স্বপন ফলে কি হোথায়
সোনার ফলে ?
মুখপানে চেয়ে হাসিলে কেবল
কথা না বলে ।

তারপরে কভু উঠিয়াছে মেঘ
কখনো রবি ---
কখনো ক্ষুব্ধ সাগর কখনো
শান্তছবি ।
বেলা বয়ে যায় , পালে লাগে বায় ----
সোনার তরনী কোথা চলে যায় ,
পশ্চিমে হেরি নামিছে তপন
অস্তাচলে
এখন বারেক শুধাই তোমায় ,
স্নিগ্ধ মরণ আছে কি হোথায় , 
আছে কি শান্তি , আছে কি সুপ্তি
তিমিরতলে ?
হাসিতেছ তুমি তুলিয়া নয়ন
কথা না বলে ।

আঁধার রজনী আসিবে এখনি
মেলিয়া পাখা ,
সন্ধ্যা-আকাশে স্বর্ণ- আলোক
পড়িবে ঢাকা ।
শুধু ভাসে তব দেহসৌরভ ,
গায়ে উড়ে পড়ে বায়ুভরে তব
কেশের রাশি ।
বিকল হৃদয় বিবশ শরীর
ডাকিয়া তোমারে কহিব অধীর ,
' কোথা আছো , ওগো , করহ পরশ
নিকটে আসি ।'
কহিবে না কথা , দেখিতে পাব না
নীরব হাসি ।

Friday, 22 November 2019

শঙ্খ

শঙ্খ

তোমার শঙ্খ ধূলায় পড়ে , কেমন করে সইব !
বাতাস আলো গেল মরে , একি রে দুর্দৈব !
লড়বি কে আয় ধ্বজা বেয়ে , গান আছে যার ওঠ না গেয়ে ,
চলবি যারা চলরে ধেয়ে ---- আয় না রে নিঃশঙ্ক ।
ধূলায় পড়ে রইল চেয়ে ওই যে অভয় শঙ্খ ।।

চলেছিলাম পূজার ঘরে সাজিয়ে ফুলের অর্ঘ্য 
খুঁজি সারা দিনের পরে কোথায় শান্তিস্বর্গ ।
এবার আমার হৃদয়ক্ষত ভেবেছিলেম হবে গত ,
ধুয়ে মলিন চিহ্ণ যত হব নিষ্কলঙ্ক ।
পথে দেখি ধূলায় নত তোমার মহাশঙ্খ ।।

আরতিদীপ এই কি জ্বালা , এই কি আমার সন্ধ্যা ?
গাঁথব রক্তজবার মালা ? হায় রজনীগন্ধা !
ভেবেছিলাম যোঝাযুঝি মিটিয়ে পাব বিরাম খুঁজি ,
চুকিয়ে দিয়ে ঋণের পুঁজি লব তোমার অঙ্ক ।
হেনকালে ডাকল বুঝি নীরব তব শঙ্খ ।।

যৌবনেরই পরশমণি করাও তবে স্পর্শ ।
দীপক তানে উঠুক ধ্বনি দীপ্ত প্রাণের হর্ষ ।
নিশার বক্ষ বিদার করে উদ্ বোধনে গগন ভরে
অন্ধ দিকে দিগন্তরে জাগাও না আতঙ্ক ।
দুই হাতে আজ তুলব ধরে তোমার জয়শঙ্খ ।।

জানি জানি তন্দ্রা মম রইবে না আর চক্ষে ।
জানি শ্রাবণ-ধারাসম বাণ বাজিছে বক্ষে ।
কেউ বা ছুটে আসবে পাশে , কাঁদবে বা কেউ দীর্ঘশ্বাসে ,
দুঃস্বপনে কাঁপবে ত্রাসে সুপ্তির পর্যঙ্ক ।
বাজবে যে আজ মহোল্লাসে তোমার মহাশঙ্খ ।।

তোমার কাছে আরাম চেয়ে পেলেম শুধু লজ্জা ।এবার সকল অঙ্গ ছেয়ে পড়াও রণসজ্জা ।
ব্যাঘাত আসুক নব নব --- আঘাত খেয়ে অচল রব ,
বক্ষে আমার দুঃখে তব বাজবে জয়ডঙ্ক ।
দেব সকল শক্তি , লব অভয় তব শঙ্খ ।।

Thursday, 19 September 2019

মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতা ------ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
মাইকেল মধুসূদন দত্ত

বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে।

করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে,
দীন যে, দীনের বন্ধু !– উজ্জল জগতে
হেমাদ্রির হেম-কান্তি অম্লান কিরণে।
কিন্তু ভাগ্য-বলে পেয়ে সে মহা পর্বতে,
যে জন আশ্রয় লয় সুবর্ণ চরণে,
সেই জানে কত গুণ ধরে কত মতে
গিরীশ। কি সেবা তার সে সুখ সদনে !

দানে বারি নদীরূপ বিমলা কিঙ্করী।

যোগায় অমৃত ফল পরম আদরে
দীর্ঘ-শিরঃ তরু-দল, দাসরূপ ধরি।
পরিমলে ফুল-কুল দশ দিশ ভরে,
দিবসে শীতল শ্বাসী ছায়া, বনেশ্বরী,
নিশায় সুশান্ত নিদ্রা, ক্লান্তি দূর করে।

Monday, 26 August 2019

শঙ্খ ঘোষের কবিতা ---- যমুনাবতী

           যমুনাবতী
            শঙ্খ ঘোষ
One more unfortunate
Weary of breath
Rashly importunate
Gone to her death. – Thomas Hood

নিভন্ত এই চুল্লীতে মা
একটু আগুন দে
আরেকটু কাল বেঁচেই থাকি
বাঁচার আনন্দে।
নোটন নোটন পায়রাগুলি
খাঁচাতে বন্দী
দু’এক মুঠো ভাত পেলে তা
ওড়াতে মন দি’।

হায় তোকে ভাত দিই কী করে যে ভাত দিই হায়
হায় তোকে ভাত দেব কী দিয়ে যে ভাত দেব হায়

নিভন্ত এই চুল্লী তবে
একটু আগুন দে –
হাড়ের শিরায় শিখার মাতন
মরার আনন্দে।
দু’পারে দুই রুই কাৎলার
মারণী ফন্দী
বাঁচার আশায় হাত-হাতিয়ার
মৃত্যুতে মন দি’।

বর্গী না টর্গী না, যমকে কে সামলায়!
ধার-চকচকে থাবা দেখছ না হামলায়?
যাস্ নে ও-হামলায়, যাস্ নে।।

কান্না কন্যার মায়ের ধমনীতে আকুল ঢেউ তোলে, জ্বলে না-
মায়ের কান্নায় মেয়ের রক্তের উষ্ণ হাহাকার মরে না-
চলল মেয়ে রণে চলল।
বাজে না ডম্বরু, অস্ত্র ঝন্ ঝন্ করে না, জানল না কেউ তা
চলল মেয়ে রণে চলল।
পেশীর দৃঢ় ব্যথা, মুঠোর দৃঢ় কথা, চোখের দৃঢ় জ্বালা সঙ্গে
চলল মেয়ে রণে চলল।

নেকড়ে-ওজর মৃত্যু এল
মৃত্যুরই গান গা-
মায়ের চোখে বাপের চোখে
দু-তিনটে গঙ্গা।
দূর্বাতে তার রক্ত লেগে
সহস্র সঙ্গী
জাগে ধক্ ধক্, যজ্ঞে ঢালে
সহস্র মণ ঘি।

যমুনাবতী সরস্বতী কাল যমুনার বিয়ে
যমুনা তার বাসর রচে বারুদ বুকে দিয়ে
বিষের টোপর নিয়ে।
যমুনাবতী সরস্বতী গেছে এ পথ দিয়ে
দিয়েছে পথ, গিয়ে।

নিভন্ত এই চুল্লীতে বোন আগুন ফলেছে।

Thursday, 8 August 2019

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা --- প্রশ্ন

প্রশ্ন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত, পাঠায়েছ বারে বারে

                     দয়াহীন সংসারে,

তারা বলে গেল "ক্ষমা করো সবে', বলে গেল "ভালোবাসো--

                     অন্তর হতে বিদ্বেষ-বিষ নাশো'।

বরণীয় তারা, স্মরণীয় তারা, তবুও বাহির-দ্বারে

আজি দুর্দিনে ফিরানু তাদের ব্যর্থ নমস্কারে।

আমি-যে দেখেছি গোপন হিংসা কপট রাত্রিছায়ে

               হেনেছে নিঃসহায়ে,

আমি-যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে

               বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে

আমি-যে দেখিনু তরুণ বালক উন্মাদ হয়ে ছুটে

কী যন্ত্রণায় মরেছে পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে।

কণ্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে, বাঁশি সংগীতহারা,

                 অমাবস্যার কারা

লুপ্ত করেছে আমার ভুবন দুঃস্বপনের তলে,

                 তাই তো তোমায় শুধাই অশ্রুজলে--

যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,

তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো।

Friday, 2 August 2019

সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা --- ইলশে গুঁড়ি

ইলশে গুঁড়ি
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

ইলশে গুঁড়ি!          ইলশে গুঁড়ি

ইলিশ মাছের ডিম।
ইলশে গুঁড়ি          ইলশে গুঁড়ি
দিনের বেলায় হিম।
কেয়াফুলে ঘুণ লেগেছে,
পড়তে পরাগ মিলিয়ে গেছে,
মেঘের সীমায় রোদ হেসেছে
আলতা-পাটি শিম্।
ইলশে গুঁড়ি          হিমের কুঁড়ি,
রোদ্দুরে রিম্ ঝিম্।
হালকা হাওয়ায়          মেঘের ছাওয়ায়
ইলশে গুঁড়ির নাচ, –
ইলশে গুঁড়ির          নাচন্ দেখে
নাচছে ইলিশ মাছ।
কেউ বা নাচে জলের তলায়
ল্যাজ তুলে কেউ ডিগবাজি খায়,
নদীতে ভাই জাল নিয়ে আয়,
পুকুরে ছিপ গাছ।
উলসে ওঠে মনটা, দেখে
ইলশে গুঁড়ির নাচ।

ইলশে গুঁড়ি          পরীর ঘুড়ি

কোথায় চলেছে,
ঝমরো চুলে          ইলশে গুঁড়ি
মুক্তো ফলেছে!
ধানের বনে চিংড়িগুলো
লাফিয়ে ওঠে বাড়িয়ে নুলো;
ব্যাঙ ডাকে ওই গলা ফুলো,
আকাশ গলেছে,
বাঁশের পাতায়          ঝিমোয় ঝিঁঝিঁ,
বাদল চলেছে।

মেঘায় মেঘায়          সূর্য্যি ডোবে

জড়িয়ে মেঘের জাল,
ঢাকলো মেঘের          খুঞ্চে-পোষে
তাল-পাটালীর থাল।
লিখছে যারা তালপাতাতে
খাগের কলম বাগিয়ে হাতে
তাল বড়া দাও তাদের পাতে
টাটকা ভাজা চাল;
পাতার বাঁশী          তৈরী করে’
দিও তাদের কাল।

খেজুর পাতায়          সবুজ টিয়ে

গড়তে পারে কে?
তালের পাতার          কানাই ভেঁপু
না হয় তাদের দে।
ইলশে গুঁড়ি – জলের ফাঁকি
ঝরছে কত বলব তা কী?
ভিজতে এল বাবুই পাখী
বাইরে ঘর থেকে; –
পড়তে পাখায়          লুকালো জল
ভিজলো নাকো সে।

ইলশে গুঁড়ি!          ইলশে গুঁড়ি!

পরীর কানের দুল,
ইলশে গুঁড়ি!          ইলশে গুঁড়ি!
ঝরো কদম ফুল।
ইলশে গুঁড়ির খুনসুড়িতে
ঝাড়ছে পাখা – টুনটুনিতে
নেবুফুলের          কুঞ্জটিতে
দুলছে দোদুল দুল্;
ইলশে গুঁড়ি           মেঘের খেয়াল
ঘুম-বাগানের ফুল।